Translate

'তপসে মাছ' —ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত

 


'তপসে মাছ' ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত

    ঊনবিংশ শতকের বাংলা কাব্যজগতে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এক উল্লেখযোগ্য কবি। তিনি দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ বিষয়কে হাস্যরস, ব্যঙ্গ এবং কৌতুকের মাধ্যমে অসাধারণ শিল্পরূপ দিয়েছেন। তাঁর রচনায় দেশজ সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, লোকজ জীবন ও সমাজচিত্র জীবন্ত হয়ে উঠেছে। 'তপসে মাছকবিতাটি তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় রম্যকবিতা। এখানে কবি তপসে মাছের রূপ, স্বাদ, গুণ এবং জনপ্রিয়তার এমন প্রশংসা করেছেন, যা একদিকে হাস্যরসাত্মক, অন্যদিকে বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির এক মূল্যবান দলিল।

 কবিতার বিষয়বস্তু

কবিতার শুরুতেই কবি তপসে মাছের রূপবর্ণনা করেছেন। মাছটির সোনালি বর্ণ, কোমল দেহ এবং গোঁফ-দাড়ির মতো মুখাবয়ব দেখে তিনি তাকে তপস্বীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। যদিও সে জলে বাস করে, তবুও তার রূপ মানুষের মনকে মুগ্ধ করে। তার শরীরের কোমলতা ও উজ্জ্বলতা যেন মাখনের মতো।

  এরপর কবি মাছটির স্বাদের বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একবার যে ব্যক্তি তপসে মাছের স্বাদ গ্রহণ করেছে, তার আর অন্য কোনো খাবারে রুচি থাকে না। মাছটির গন্ধ, স্বাদ ও রূপ মানুষের মন ও প্রাণকে আনন্দে ভরিয়ে তোলে। কবির এমন অতিরঞ্জিত প্রশংসার মধ্যেই হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে।

   কবি জানান, বাজারে তাজা তপসে মাছ দেখলে তিনি কিনে এনে ছাঁকা তেলে ভেজে খেতে ভালোবাসেন। তাঁর মতে, যে ব্যক্তি তপসে মাছ খায় না, তার জীবনই যেন বৃথা। এই উক্তির মধ্যে কবির রসিকতা ও অতিশয়োক্তি স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

 তপসে মাছের মাহাত্ম্য

কবি তপসে মাছের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠার জন্য কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সমুদ্র মন্থনের সময় দেবতা ও অসুরদের অমৃতলাভের যে ঘটনা ঘটেছিল, সেই অমৃতমিশ্রিত জল তপসে মাছ পান করেছিল। তাই তার শরীরে ও স্বাদে অমৃতের গুণ এসেছে। এই কল্পনা সম্পূর্ণ রসসৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে।

 তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইংরেজ বা সাহেবরাও এই মাছের স্বাদে মুগ্ধ হয়ে একে "ম্যাঙ্গো ফিশ" নামে ডাকত। তাদের খাদ্যতালিকাতেও তপসে মাছের বিশেষ স্থান ছিল। তবে কবি রসিকতার সঙ্গে বলেন, সাহেবরা বাঙালিদের মতো সুস্বাদু রান্না করতে জানে না; তারা কেবল সেদ্ধ করে খায়। এতে বাঙালির রন্ধনশৈলীর শ্রেষ্ঠত্বও ইঙ্গিত করা হয়েছে।

 হাস্যরস ও ব্যঙ্গ

এই কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল হাস্যরস। তপসে মাছকে নিয়ে কবির অগাধ ভালোবাসা এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছে যে তা পাঠককে আনন্দ দেয়। কোথাও কোথাও ব্যঙ্গও রয়েছে। যেমন, তিনি বলেন যে, যদি তিনি ইংরেজ হতেন, তবে টেবিলে বসে সাহেবদের মতো তপসে মাছ খেতে পারতেন। আবার তিনি উত্তরবঙ্গের মানুষদের উদ্দেশে বলেন, তারা তপসে মাছের প্রকৃত গুণ জানে না। এটি সম্পূর্ণ কৌতুকের ছলে বলা হয়েছে।

 লোকজ জীবন ও খাদ্যসংস্কৃতি

কবিতায় বাঙালির খাদ্যরুচি ও লোকজ সংস্কৃতির এক সুন্দর ছবি পাওয়া যায়। তপসে মাছ ভাজা, ঝোল, ঝাল কিংবা আচার দিয়ে খাওয়ার উল্লেখ থেকে বোঝা যায় যে বাঙালির রান্নার বৈচিত্র্য কত সমৃদ্ধ। মাছের ডিমের স্বাদ, গর্ভবতী মাছের প্রতি আকর্ষণ, বাজার থেকে মাছ কেনা, রান্নার পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ের মাধ্যমে কবি তৎকালীন সমাজজীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন।

 ভাষা ও অলংকার

কবিতার ভাষা অত্যন্ত সহজ, প্রাঞ্জল এবং কথ্যধর্মী। দেশজ শব্দ, ছড়ার মতো ছন্দ এবং অনুপ্রাস অলংকারের ব্যবহারে কবিতাটি প্রাণবন্ত হয়েছে। "কষিত-কনককান্তি কমনীয় কায়", "গোঁৎ করে সোঁৎ ঠেলে" প্রভৃতি পঙ্ক্তিতে অনুপ্রাস ও ধ্বনিসৌন্দর্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অতিশয়োক্তি, উপমা, রূপক ও কল্পনার চমৎকার প্রয়োগ কবিতাটিকে আরও আকর্ষণীয় করেছে।

 ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'তপসে মাছবাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রম্যকবিতা। তপসে মাছের রূপ, স্বাদ ও মাহাত্ম্যকে কেন্দ্র করে কবি হাস্যরস, ব্যঙ্গ, অতিশয়োক্তি এবং লোকজ সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন। কবিতাটি যেমন পাঠককে আনন্দ দেয়, তেমনি উনিশ শতকের বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ও সামাজিক জীবনের পরিচয়ও তুলে ধরে। সহজ ভাষা, প্রাণবন্ত ছন্দ এবং অনবদ্য রসসৃষ্টির জন্য এই কবিতা আজও সমান জনপ্রিয় ও স্মরণীয়।

 কবিতার তাৎপর্য

'তপসে মাছ' কেবল একটি মাছের প্রশস্তিগান নয়। এর মধ্যে বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি, রসবোধ, লোকজ ঐতিহ্য এবং কবির কৌতুকপ্রিয় মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। সামান্য একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে যে অসাধারণ সাহিত্য সৃষ্টি করা যায়, এই কবিতা তার উজ্জ্বল উদাহরণ। এতে কবির দেশজ চেতনা এবং সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে গভীর পরিচয় প্রতিফলিত হয়েছে।


 

কোন মন্তব্য নেই

ok

4x6 থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.