'তপসে মাছ' —ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত
'তপসে মাছ' — ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত
কবিতার শুরুতেই কবি তপসে মাছের রূপবর্ণনা করেছেন। মাছটির সোনালি বর্ণ, কোমল দেহ এবং গোঁফ-দাড়ির মতো মুখাবয়ব দেখে তিনি তাকে তপস্বীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। যদিও সে জলে বাস করে, তবুও তার রূপ মানুষের মনকে মুগ্ধ করে। তার শরীরের কোমলতা ও উজ্জ্বলতা যেন মাখনের মতো।
এরপর কবি মাছটির স্বাদের বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একবার যে ব্যক্তি তপসে মাছের স্বাদ গ্রহণ করেছে, তার আর অন্য কোনো খাবারে রুচি থাকে না। মাছটির গন্ধ, স্বাদ ও রূপ মানুষের মন ও প্রাণকে আনন্দে ভরিয়ে তোলে। কবির এমন অতিরঞ্জিত প্রশংসার মধ্যেই হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে।
কবি জানান, বাজারে তাজা তপসে
মাছ দেখলে তিনি কিনে এনে ছাঁকা তেলে ভেজে খেতে ভালোবাসেন। তাঁর মতে, যে ব্যক্তি তপসে
মাছ খায় না, তার জীবনই যেন
বৃথা। এই উক্তির মধ্যে কবির রসিকতা ও অতিশয়োক্তি স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
কবি তপসে মাছের মাহাত্ম্য
প্রতিষ্ঠার জন্য কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সমুদ্র মন্থনের সময় দেবতা ও অসুরদের অমৃতলাভের যে ঘটনা
ঘটেছিল, সেই অমৃতমিশ্রিত জল তপসে মাছ পান করেছিল। তাই তার শরীরে ও স্বাদে অমৃতের গুণ
এসেছে। এই কল্পনা সম্পূর্ণ রসসৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল
হাস্যরস। তপসে মাছকে নিয়ে কবির অগাধ ভালোবাসা এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছে যে তা
পাঠককে আনন্দ দেয়। কোথাও কোথাও ব্যঙ্গও রয়েছে। যেমন, তিনি বলেন যে, যদি তিনি ইংরেজ হতেন, তবে টেবিলে বসে সাহেবদের মতো তপসে মাছ খেতে পারতেন। আবার তিনি উত্তরবঙ্গের
মানুষদের উদ্দেশে বলেন, তারা তপসে মাছের প্রকৃত গুণ জানে না। এটি সম্পূর্ণ কৌতুকের ছলে বলা হয়েছে।
কবিতায় বাঙালির খাদ্যরুচি ও লোকজ
সংস্কৃতির এক সুন্দর ছবি পাওয়া যায়। তপসে মাছ ভাজা, ঝোল, ঝাল কিংবা আচার দিয়ে খাওয়ার উল্লেখ থেকে বোঝা যায় যে বাঙালির রান্নার
বৈচিত্র্য কত সমৃদ্ধ। মাছের ডিমের স্বাদ, গর্ভবতী মাছের প্রতি আকর্ষণ, বাজার থেকে মাছ কেনা, রান্নার পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ের মাধ্যমে কবি তৎকালীন
সমাজজীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন।
কবিতার ভাষা অত্যন্ত সহজ, প্রাঞ্জল এবং কথ্যধর্মী। দেশজ শব্দ, ছড়ার মতো ছন্দ এবং অনুপ্রাস অলংকারের ব্যবহারে কবিতাটি
প্রাণবন্ত হয়েছে। "কষিত-কনককান্তি কমনীয় কায়",
"গোঁৎ করে সোঁৎ ঠেলে" প্রভৃতি
পঙ্ক্তিতে অনুপ্রাস ও ধ্বনিসৌন্দর্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অতিশয়োক্তি, উপমা, রূপক ও কল্পনার চমৎকার প্রয়োগ কবিতাটিকে আরও আকর্ষণীয় করেছে।
'তপসে মাছ' কেবল একটি মাছের প্রশস্তিগান নয়। এর মধ্যে বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি, রসবোধ, লোকজ ঐতিহ্য এবং কবির কৌতুকপ্রিয় মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। সামান্য একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে যে অসাধারণ সাহিত্য সৃষ্টি করা যায়, এই কবিতা তার উজ্জ্বল উদাহরণ। এতে কবির দেশজ চেতনা এবং সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে গভীর পরিচয় প্রতিফলিত হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই
ok