Translate

গল্প: হারিয়ে যাওয়া বিকেল

 


নিচের গল্পটি ছাত্র-ছাত্রীদের মোবাইল আসক্তি এবং বাবা-মায়ের ভূমিকা নিয়ে রচিত একটি হৃদয়স্পর্শী ও চমকপ্রদ গল্প।

 

                               হারিয়ে যাওয়া বিকেল

                                  নীলোৎপল জানা

 

   সালটা ২০২০, রাক্তিম নবম শ্রেণির ছাত্র। একসময় সে ছিল পাড়ার সবার প্রিয় ছেলে। স্কুল থেকে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে ফুটবল খেলত, দাদুর কাছে গল্প শুনত, আর মায়ের সঙ্গে বসে পড়াশোনা করত। কিন্তু গত এক বছরে যেন সবকিছু বদলে গেল। দেখা দিল মহামারী। স্কুল,কলেজ বন্ধ। পড়া-শোনা শিকেয় উঠেছে।

   বাবা একটি নতুন স্মার্টফোন কিনে দিয়েছিলেন  রাক্তিমকে । প্রথমে অনলাইন ক্লাসের জন্য ফোনটি ব্যবহার করত রক্তিম ধীরে ধীরে পড়াশোনার পাশাপাশি ভিডিও দেখা, গেম খেলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানো তার অভ্যাস হয়ে উঠল। তারপর সেই অভ্যাস ধীরে ধীরে নেশায় পরিণত হল। অনলাইন গেমে এমন অভ্যস্ত ও নেশায় পড়ল যে এখন স্কুল থেকে ফিরে সে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। মা ডাকলেও সাড়া দেয় না। খাওয়ার সময়েও ফোন হাতে থাকে। রাত গভীর পর্যন্ত জেগে থাকে, সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারে না। যা হবার তাই হল ; পরীক্ষার ফলও খারাপ হতে শুরু করল।

 

রাক্তিমর মা মধুমিতা দেবী খুব চিন্তায় পড়লেন। তিনি বকাঝকা করতেন, ফোন কেড়ে নিতেন, আবার কখনও কান্নাকাটি করতেন। কিন্তু কিছুতেই কোনো লাভ হচ্ছিল না। রাক্তিম আরও জেদি হয়ে উঠছিল।

একদিন স্কুল থেকে ফোন এল। শ্রেণিশিক্ষক জানালেন, রাক্তিম ক্লাসে মনোযোগ দিচ্ছে না। আগের মতো প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারছে না। খবর শুনে বাবা-মা দুজনেই ভীষণ উদ্বিগ্ন হলেন। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে বুকের পাঁজরের মধ্যে যন্ত্রণা অনুভব করল। কারণ রাক্তিম তাঁদের একমাত্র সন্তান!

 

   সেদিন রাতে রাক্তিমের বাবা অমিতবাবু ছেলের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দেখলে, রাত প্রায় একটা বাজে, তবু রাক্তিম মোবাইলের পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ তিনি নিজের কথাই ভাবতে লাগলেন। অফিস থেকে ফিরে তিনিও তো সারাক্ষণ ফোনেই ব্যস্ত থাকেন। ছেলের সঙ্গে কতদিন গল্প করেননি! পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়ার অভ্যাসও প্রায় উঠে গেছে। রাক্তিমের প্রতি সকল কর্তব্য অমিতবাবু ভুল গেছেন। পরদিন থেকে অমিতবাবু একটি সিদ্ধান্ত নিলেন; রাত আটটার পর বাড়িতে কেউ মোবাইল ব্যবহার করবে না। শুধু রক্তিম নয়, বাবা-মাও নয়। প্রথম দিন রক্তিম খুব রাগ করল। চিৎকার করে বলল, “আমার সব বন্ধুরা ফোন ব্যবহার করে। শুধু আমাকেই কেন আটকানো হচ্ছে?”

   অমিতবাবু শান্ত গলায় বললেন, “তোমাকে আটকানো হচ্ছে না বাবা, আমরা সবাই একসঙ্গে বদলানোর চেষ্টা করছি।”

রাক্তিম দু-তিন দিন রাগ করলেও পরে ঠিক হয়ে যায়।

   ধীরে ধীরে নতুন নিয়ম চালু হল। রাতের খাবার সবাই একসঙ্গে খেতে লাগল। বাবা বাড়ি ফিরে অফিসের গল্প বলতেন, মা ছোটবেলার মজার ঘটনা শোনাতেন। সপ্তাহান্তে তারা কাছে-পিঠে পার্কে ঘুরতে যেতেন। প্রথমদিকে রাক্তিম অনিচ্ছুক থাকলেও পরে সে ধীরে ধীরে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে শুরু করল।

কিন্তু এর মধ্যেই ঘটল একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা।

 

একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে রক্তিম রাস্তা পার হচ্ছিল মোবাইলের পর্দায় চোখ রেখে।। হঠাৎ একটি দ্রুতগতির বাইক তার একেবারে সামনে এসে পড়ে। সৌভাগ্যবশত একজন পথচারী তাকে টেনে সরিয়ে নেন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসে রক্তিম।

 

  ঘটনাটি রক্তিমকে ভিতর থেকে নাড়া দিল। ভাবতে লাগল- ‘বাবা কত বার সাবধান করেছেন,শুনিনি’।

সেদিন রাতে সে ঘুমোতে পারছিল না। বারবার মনে হচ্ছিল, যদি ওই মানুষটি তাকে না বাঁচাতেন? যদি বাবা-মা তাকে হারিয়ে ফেলতেন?

ভোরের দিকে সে মায়ের ঘরে গিয়ে চুপচাপ কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ল। মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে খোকা?”

   রক্তিম মায়ের হাত ধরে বলল, “মা, আমি ভুল করেছি। তোমরা আমাকে বারবার বোঝাতে চেয়েছিলে মোবাইল সবসময় দখা ভলো নয়, আমি শুনিনি। গতকাল আমার শেষ দিন হত!

   মধুমিতা দেবীর চোখে জল এসে গেল। তিনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন

   ধীরে ধীরে এরপর রক্তিম নিজের জীবনকে নতুনভাবে গুছিয়ে নিতে শুরু করল। মোবাইল ব্যবহার করত, কিন্তু নির্দিষ্ট সময় মেনে। আবার মাঠে খেলতে শুরু করল। পড়াশোনায় মন দিল। বন্ধুদের সঙ্গেও বাস্তবে বেশি সময় কাটাতে লাগল।

 

   কয়েক মাস পরে স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে একটি বক্তৃতা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হল। বিষয় ছিল— “মোবাইল: বন্ধু না শত্রু?” ক্তিম সেখানে প্রথম স্থান অধিকার করল।

   মঞ্চে দাঁড়িয়ে সে বলল, “মোবাইল কখনও শত্রু নয়। কিন্তু আমরা যদি তাকে আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রক বানিয়ে ফেলি, তখন সে বিপদ ডেকে আনে। আর সন্তানদের শুধু বকাঝকা করে নয়, তাদের পাশে থেকে, সময় দিয়ে, নিজেরাও ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করে, বাবা-মায়েরা তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারেন।”

    সারা হলঘর করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠল।

 

   প্রথম সারিতে বসে থাকা অমিতবাবু ও মধুমিতা দেবীর চোখে তখন আনন্দের অশ্রু। তারা বুঝলেন, সন্তানকে শুধু প্রযুক্তি দেওয়াই যথেষ্ট নয়; তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন ভালোবাসা, সময় এবং সঠিক দিশা।

   সেদিন বাড়ি ফেরার পথে রক্তিম আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল সূর্য ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধরে, পাখিরা বাসায় ফরছে শান্ত-ভাবে। অনেকদিন পর সে অনুভব করল, মোবাইলের পর্দার বাইরে পৃথিবীটা কত সুন্দর! সেই হারিয়ে যাওয়া বিকেল যেন আবার তার জীবনে ফিরে এসেছে।

--------------------0

কোন মন্তব্য নেই

ok

4x6 থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.