লোকসংগীত ড. নীলোৎপল জানা
লোকসংগীত
সংগীত মানুষের সহজাত বিষয়। সেই কবে জয়দেবের 'গীতগোবিন্দ' থেকে শুরু করে 'চর্যাপদ'
হয়ে এখনো বাঙালির প্রাণে, মজ্জায় গীতসুধা প্রবাহিত। তবে সমাজ বিভাজনের
কারণে দুই ভাবে সংগীত বিভাজিত,শিষ্টসংগীত ও লোকসংগীত। শিষ্টসংগীত মূলত শিষ্ট সমাজেই সৃষ্টি হয়,
যা অতি প্রযত্ন, সুষ্ঠু চর্চা ও অনুশীলনের ফল। আর এখানে
নির্দিষ্ট স্রষ্টার নাম পাওয়া যায়। লোকসংগীত হল-লোকসমাজ কর্তৃক সৃষ্ট একটি মাত্র
ভাব অবলম্বনে মৌখিক প্রচারিত সংগীত। পাশ্চাত্যে অষ্টাদশ শতক থেকে লোকসংগীত সংগ্রহে
আগ্রহ দেখা গেছে। বঙ্গে ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য চার খণ্ডে 'বঙ্গীয় লোকসঙ্গীত রত্নাকর'-সংগ্রহ গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন, যা অদ্বিতীয়।
লোকসংগীতের বৈশিষ্ট্য
১. লোকসংগীত কবে সৃষ্টি হয়েছে এর সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ নেই।
২. লোকসংগীত অনেক সময় নাট্য ও নৃত্য সহযোগে গীত হয়।
৩. লোকসংগীতের মধ্যে আঞ্চলিক বিষয় প্রাধান্য পায়। বিশেষ করে প্রেম, যন্ত্রণা, বেদনা ইত্যাদি।
৪. কোনো কোনো লোকসংগীতে নিটোল কাহিনি থাকে।
৫. লোকসংগীত মূলত Oral tradition বলে এতে গায়কের স্মৃতি প্রাধান্য পায়।
৬. লোকসংগীত তাৎক্ষণিক সৃষ্টি, স্বতঃস্ফূর্ত। তবে অশ্লীলতা থাকলেও তা বিচার্য নয়।
৭. এই সংগীত কোনো ব্যাকরণ মানে না।
৮. এই সংগীতের ভাষা প্রধানত আঞ্চলিক।
৯. লোকসংগীতের দুটি অর্থ থাকে, একটা বাহ্যিক অন্যটি আন্তরিক।
১০. এই সংগীতে গায়কের উচ্ছ্বাস প্রাধান্য পায়।
ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেছেন-
"লিখিত.... সাহিত্য একটি বিশেষ অনমনীয় (rigid) রূপ লাভ করে, কিন্তু যাহা কেবল সমাজের স্মৃতিপথ অবলম্বন করিয়া
মৌখিক প্রচার লাভ করে, তাহার
মধ্যে কখনও একটি সুনির্দিষ্ট রূপ গড়িয়া উঠিতে
পারে না। প্রবাহমানতার মধ্য দিয়াই লোকসংগীতের প্রাণশক্তি রক্ষা পায়।"
(বাংলার লোকসাহিত্য, তৃতীয়
খণ্ড)
উল্লেখযোগ্য লোকসংগীতগুলি হল-ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, ঝুমুর।
লোকসংগীত সম্পর্কে বিশিষ্টদের বক্তব্য
(১) "লোকগীতগুলি রচিত হয় মুখে মুখে এবং তা প্রচারও লাভ করে মুখে মুখে।
নিরক্ষরতাই এজন্য একমাত্র দায়ী নয়। গ্রামাঞ্চলে অদ্যাপি বলবৎ Oral
tradition বা মুখস্থ রাখার ঐতিহ্য এবং
স্মৃতিকেই ধরে রাখার ক্ষমতা প্রাচুর্যও এজন্য দায়ী।" (লোকসংস্কৃতি /
অনিমেশকান্তি পাল)
(২) "লোকসংগীত রচনার সময় কিংবা স্রষ্টা সম্পর্কে যে নিশ্চিতভাবে কোনও তথ্য
জানা যায় না, তার কারণ ব্যক্তি
বিশেষের দ্বারা বিশেষ কোনও সংগীত রচিত হলেও তিনি সেই সংগীত রচনা করেন সংহত সমাজের
মুখপাত্র রূপে। আর রচিত সংগীতে ব্যক্তি বিশেষের হৃদয়ানুভূতিটুকুই শুধু বিধৃত হয় না,
সমগ্র সমাজের অভিজ্ঞতাটুকুও প্রতিফলিত
হয়।"
(বাংলা লোকসাহিত্য চর্চার ইতিহাস / বরুণকুমার চক্রবর্তী)
(৩) "অর্থনৈতিক উপলক্ষ্য এবং জীবনচর্চা, এরা আবার সময়ের বিবর্তনে শ্রেণিচেতনার অভিজ্ঞানকেও
রূপায়িত করে। তখন লোকসঙ্গীত একক বা দ্বৈতকণ্ঠের সৃষ্টিরূপেও আত্মপ্রকাশ করে থাকে।
ব্যক্তিগত সুখ দুঃখও তখন ওই লৌকিক ঐতিহ্যের শিল্পকলায় সৃষ্টি করে এক ধরনের
সর্বজনীন আবেগের। এই সমস্ত কারণেই লোকসঙ্গীতের রূপটি প্রতিভাত হয় বহুমাত্রিক
হয়েই।" (লোকসংস্কৃতির সীমানা ও স্বরূপ / পল্লব সেনগুপ্ত)
(৪) "লোকসঙ্গীতের প্রধান বিশেষত্ব এই যে, ইহা মৌখিক রচিত হইয়া মৌখিক প্রচার লাভ করে, সমাজের মধ্যে শিক্ষাবিস্তার করিলেও কোনও
দিনই ইহা লিখিয়া রাখিবার সংস্কার গড়িয়া উঠে না।... প্রবহমানতার মধ্য দিয়াই
লোকসঙ্গীতের প্রাণশক্তি রক্ষা পায়। নূতন নূতন যুগে উত্তীর্ণ হইয়া ইহার মধ্যে নূতন
নূতন উপকরণ সংগৃহীত হয় এবং তাহার ফলেই ইহার কোনও অংশেই জীর্ণতা স্পর্শ করিতে পারে
না।" (বাংলার লোকসাহিত্য, ৩য়
খণ্ড / আশুতোষ ভট্টাচার্য)
লোকসংগীত ও শাস্ত্রীয় সংগীতের
আলোচনা
ইংরেজিতে যাকে classical
song বলা হয়
বাংলায় তাকেই শাস্ত্রীয় সংগীত বলা হয়। এর সঙ্গে লোকসংগীতের বহুল পার্থক্য লক্ষ করা
যায়।
১. লোকসংগীতের ভাষা সতত পরিবর্তিত হয় নদীর মতো। কিন্তু
শাস্ত্রীয় সংগীতের ভাষা সর্বদা শিষ্ট ভাষাশ্রয়ী।
২ লোকসংগীত সর্বদা আধুনিক। শাস্ত্রীয় সংগীত সর্বদা একটি
নির্দিষ্ট আদর্শ অনুসরণ করে চলে।
৩. লোকসংগীত মৌখিক আর শাস্ত্রীয় সংগীত লিখিত।
8 শাস্ত্রীয় সংগীত লিখিত বলে
অনুশীলনের দ্বারা আয়ত্ত করতে হয়। কিন্তু লোকসংগীত অলিখিত বলে অনুশীলনের প্রয়োজন হয়
না।
৫ শাস্ত্রীয় সংগীতের নীতিরীতি জটিল, অন্যদিকে লোকসংগীত খোলামেলা।
৬. লোকসংগীতের সুর খোলামেলা,
মেঠো। শাস্ত্রীয়
সংগীতে সুব, তাল,
লয় জটিল।
লোকসংগীতের শ্রেণিবিভাগ
লোকসংগীতকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়-১. সারি, ২. ভাটিয়ালি। তবে লোকগবেষক ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য 'বাংলার লোকসাহিত্য' গ্রন্থে (প্রথম খণ্ডে) পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন-
(ক) আঞ্চলিক লোকগীত(খ)
ব্যবহারিক লোকগীত(গ)
আনুষ্ঠানিক লোকগীত(ঘ) প্রেম
সংগীত(ঙ) কর্ম সংগীত
(ক) আঞ্চলিক লোকসংগীত
লোকসংগীত মূলত আঞ্চলিক। তবে আঞ্চলিক লোকসংগীত বলতে বোঝায় অঞ্চলে প্রচলিত,
সমগ্র বাংলায় প্রচলিত নয়। এই সংগীতে
আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহৃত হয়। এই ধরনের সংগীতগুলি হল-ভাটিয়ালি, পটুয়ার গান, ভাওয়াইয়া ভাদুগান, টুসুগান,
ঝুমুর গান, গম্ভীরা ইত্যাদি।
ভাটিয়ালি
সংগীত
ভাটিয়ালি পূর্ববঙ্গের এক জনপ্রিয় লোকসংগীত। নদীমাতৃক বাংলাদেশে ভাটিয়ালির
সৃষ্টি। ড. ভট্টাচার্য বলেছেন-
ভাটিয়ালি বিশেষ কোনো এক শ্রেণির সংগীতের নাম নহে, ইহা লোকসংগীতের একটি সুরের নাম।” (বাংলার
লোকসাহিত্য- তৃতীয়খণ্ড)
গীতশ্রী সাবিত্রী ঘোষ ভাটিয়ালি সম্পর্কে বলেছেন-সাধারণত এই ধরনের গান
মাঝিরা নদীপথে গেয়ে থাকে। এ গানের মধ্যে আছে আত্মসমর্পণ ও আত্মনির্ভরতার আকৃতি।
মানুষ যখন একান্ত একা মনে করে, তখন, সে সমস্ত অন্তর দিয়ে
ভগবানের কাছে আত্মসমর্পণ করে-প্রকাশ করে নিজ অস্তরের বেদনা।" (বাংলা গানের
ইতিবৃত্ত)। আশরাফ সিদ্দিকী বলেছেন-
"নদীর ভাটি দিয়ে নৌকা বেয়ে যেতে সাধারণ নৌকার মাঝিগণ যে গান গাইত তাকেই
ভাটিয়ালি বলা হয়।" (লোকসাহিত্য ৩য় খণ্ড)
ভাটিয়ালি গানের বিষয়বস্তু স্থির নয়, মূলত প্রেম ও প্রকৃতি এই সংগীতে প্রাধান্য পায়। ভাটিয়ালির সঙ্গে নদীর সম্পর্ক
সব সময় থাকে না, বরং বলা যায়
প্রকৃতির মুক্ত আনন্দের গান। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেছেন-"কেবল মাত্র নদীর
সঙ্গে যে ভাটিয়ালিব সম্পর্ক তাহাই নহে- বিশাল প্রান্তরের দিগন্ত প্রসারিত বিস্তার,
তাহার উপর দিয়া নিঃসঙ্গ অলস মন্থর গতি
পথযাত্রা, প্রকৃতির মধ্যে
উদাসী বিষণ্ণ বৈরাগ্যের রূপ-ইহারা ভাটিয়ালির প্রেরণা দান করিয়া থাকে।"
এই সঙ্গীত একক সঙ্গীত, গায়কের
সামনে যেমন শ্রোতা থাকে না তেমনি কোনো দায়বদ্ধতাও থাকে না। এই সংগীতের সঙ্গে কোনো
সংস্কার বা বিশ্বাসের কোনো সম্পর্ক নেই। গায়কের কণ্ঠে আশা ও নৈরাশ্যের সুর
প্রকটিত। দুটি ভাটিয়ালি সংগীত তুলে দেওয়া হল-
১. আমার মনের মানুষ, প্রাণ
সই গো, পাই গো কোথা গেলে।
আমি যাব সেই দেশে যে দেশে মানুষ মিলে।।
যদি মনের মানুষ পেতেম,
তারে হৃদ-মাঝারে বসাইতেম, অতি যতন কইরে;
আমি মনসূতে মালা গেঁথে দিতেম তাহার গলে।।
ভেবেছিলাম মনে মনে,
সে যাবে না আমায় ছেড়ে, তারে
আপন বইলে,
সে যে ফাঁকি দিয়ে গেল চলে,
এই কি ছিল মোর কপালে।।
২. আমা দিয়ে হবে না নাগর, ঠিক ধরিয়ে বসেছি।
ভাব না জেনে ভাবে মজে, হুজুকেতে
মজেছি।।
প্রেমের বাজার দেখতে ভাল
আমার ভাগ্য না হইল,
কত এল কত গেল, ব'সে ব'সে দেখেছি।।
বড় কইরে ছিলাম আশা,
পুরাইব মনের আশা,
যেমন তাল গাছে বাবুইর বাসা, মেঘের জলে ভিজিতেছি।।
বামন হইয়ে চান ধরা,
আমার তেগ্নি প্রেম করা,
মৃগী যেমন তৃষ্ণাতুরা মরুভূমে ঘুরতেছি।।(লোকসংগীত চর্চা-শীতল চৌধুরী)
ভাওয়াইয়া
ভাওয়াইয়া মূলত উত্তরবঙ্গের চড়াই-উৎরাই অঞ্চলের লোকসংগীত। ভাব ইয়া প্রত্যয়
যুক্ত করে ভাওয়াইয়া নামরকণ হয়েছে। যে গানের মূল হল ভাব। এই সংগীত মূলত কোচবিহার,
জলপাইগুড়ি, পূর্ববঙ্গের রঙপুর, আসামের কিছু অংশে লক্ষ করা যায়। এই গান সম্পর্কে ড.
আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেছেন-
"অরণ্য প্রকৃতির স্তব্ধতার মধ্য হইতেই ভাওয়াইয়ার সংগীতের সুরে দীর্ঘ টানের জন্ম
হইয়াছে, ইহার দীর্ঘ-টান কিংবা
চড়া সুর সম্পূর্ণ ভাটিয়ালির মত নহে; ভাটিয়ালির সুরে কোনো ভাঁজ নাই, কিন্তু ভাওয়াইয়া দীর্ঘ একটানা চড়া সুরের মধ্যে ভাঁজ আছে; অবশ্য এই ভাঁজ তালপ্রধান সঙ্গীদের মত স্পষ্ট
নহে। ভাঁজের ভিতর দিয়াও একটানা চড়া সুরের গতি ব্যাহত হয় না।" (বাংলার
লোকসাহিত্য-৩য় খণ্ড)
এ কারণে হয়তো ওই গানের একটা মাদকতা আছে। প্রেম ভাবনার সঙ্গে জীবনের এক নিবিড়
যোগ লক্ষ করা যায়। আবদুল হাফিজ বলেছেন-
"বিরহের বিষয়বস্তুকে এমন গভীরভাবে আর কোনও লোকসংগীত গ্রহণ করেনি।"
বিরহ বা বিচ্ছেদকে কেন্দ্র করেই ভাওয়াইয়া গান কেবলমাত্র রচিত। বৈষ্ণব পদাবলিতে
কৃষ্ণ যেমন নায়ক তেমনি ভাওয়াইয়া গানের নায়ক প্রধানত অরণ্যপথচারী মৈষাল। আবার উত্তর
বাংলার দুস্তর পার্বত্য নদীর নৌকার মাঝিও ভাওয়াইয়া গানে গায়ক রূপে উপস্থিত হয়েছে।
"নাইয়াবে-
চাপাও নৌকা কমলাসুন্দরীর ঘাটে রে।
নাও বাইয়া যাও নাইয়া রে
তোর সে মনের সুখ।
ওরে নায়র বাদাম তুলিয়া, নাইয়া
রে,
দেখাও চন্দ মুখ রে,
মনে বড় সুখ নাইয়ারে,
চিত্তে বড় দুখ।
ওরে নদীর পাথারের মত
ভাঙ্গে নদীর বুক রে।।
নদীর মাঝে থাক নাইয়ারে
নায়ের কাণ্ডারী।
ওরে অভাগিনী নারীর নাইরে,
নাইয়া যৌবনের ব্যাপারী রে।।"
এখানে স্বামী সঙ্গ ছাড়া নারী দীর্ঘশ্বাস প্রকাশিত।
ঝুমুর
ঝুমুর মূলত লক্ষ করা যায় বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া জেলায়।
এক সময় আদিবাসীদের মধ্যে এই সংগীতের প্রচলন ছিল। উত্তরে সাঁওতাল পরগনা থেকে শুরু
করে দক্ষিণে সমগ্র ছোটনাগপুর ও পশ্চিমে মধ্যপ্রদেশের পূর্বভাগ পর্যন্ত আদিবাসীদের
মধ্যে ঝুমুরগানের প্রচলন ছিল। সাঁওতাল পরগনার মুণ্ডাবাসী-সাঁওতালদের মধ্যে
ঝুমুরগান সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
ঝুমুর গানের মূল বিষয় হল প্রেম। তবে কোনো কোনো ঝুমুরগানে লৌকিক বিষয়ও স্থান
লাভ করেছে। একটি ঝুমুরের কয়েকটি চরণ-
কোন সে মেয়ে জীবনটা যার শেষ হল ঐ
ও বন্ধু গঙ্গা এবং যমুনাতে ওর খোঁপার ফুলটা ভাসে
ছোট্ট মেয়েটি অল্প সময়ে শেষ হল ঐ
ও বন্ধু, গঙ্গা এবং
যমুনাতে ওর খোঁপার ফুলটা ভাসে।
ঝুমুর গানেকে ছয়টি ভাগে ভাগ করা যায়-
(ক) দাঁড়শালিয়া ঝুমুর(খ) ছো
নাচের ঝুমুর(গ) খেমটি ঝুমুর(ঘ) পাতা নাচের ঝুমুর(ঙ) ভাদুরিয়া ঝুমুর(চ) করম নাচের ঝুমুর

কোন মন্তব্য নেই
ok