আচার্য অভিনব গুপ্ত : ড. নীলোৎপল জানা
আচার্য অভিনব গুপ্ত
ভূমিকা
ভারতীয় কাব্যতত্ত্বের ইতিহাসে অভিনবগুপ্ত এক অনন্য
নাম। তিনি শুধু একজন দার্শনিক বা সমালোচক নন, বরং রসতত্ত্বকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দেওয়া
এক যুগস্রষ্টা মনীষী। দশম শতকের শেষভাগ থেকে একাদশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত সময়কালে কাশ্মীরে
তাঁর আবির্ভাব। এই সময়টি ছিল ভারতীয় দর্শন ও সাহিত্যচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। অভিনবগুপ্ত
তাঁর অসামান্য পাণ্ডিত্য, গভীর দার্শনিক দৃষ্টি এবং সূক্ষ্ম রসবোধের দ্বারা কাব্যতত্ত্বকে
নতুন ব্যাখ্যা ও মর্যাদা প্রদান করেন। বিশেষত রসবাদ ও ধ্বনিতত্ত্বের সমন্বয়ে তিনি যে
তাত্ত্বিক কাঠামো নির্মাণ করেন, তা আজও ভারতীয় সাহিত্যসমালোচনার ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত।
অভিনবগুপ্তের
কীর্তি ও মনীষা
অভিনবগুপ্ত ছিলেন কাশ্মীরীয় শৈব দর্শনের একজন
প্রধান আচার্য। শৈব মত সম্পর্কে তিনি বহু দার্শনিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তবে সাহিত্যতত্ত্বের
ক্ষেত্রে তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি দুটি গ্রন্থে কেন্দ্রীভূত। প্রথমটি আনন্দবর্ধনের ‘ধ্বন্যালোক’-এর
ওপর রচিত টীকা ‘লোচন’ এবং দ্বিতীয়টি ভরতের ‘নাট্যশাস্ত্র’-এর ভাষ্য ‘অভিনবভারতী’।
এই ‘লোচন’ গ্রন্থে
তিনি ধ্বনিতত্ত্বের গভীর ও সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। আনন্দবর্ধনের ধ্বনি-ধারণাকে
তিনি কেবল ব্যাখ্যা করেননি, বরং তার অন্তর্নিহিত রসতাত্ত্বিক তাৎপর্য স্পষ্ট করেছেন।
অন্যদিকে ‘অভিনবভারতী’ গ্রন্থে নাট্যশাস্ত্রের রসসূত্রকে তিনি নতুন আলোয় ব্যাখ্যা করেন
এবং রসের নিষ্পত্তি বিষয়ে নিজের মৌলিক মত স্থাপন করেন।
রসবাদী
না রসধ্বনিবাদী
অভিনবগুপ্তকে রসবাদী না রসধ্বনিবাদী বলা হবে,
এই প্রশ্ন বহু আলোচিত। ব্যবহারিক দিক থেকে এই দুই ধারার মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। ধ্বনিবাদে
ব্যঙ্গার্থ বা ইঙ্গিতের গুরুত্ব বেশি, আর রসবাদে রসানুভূতির প্রাধান্য লক্ষ করা যায়।
তবে তত্ত্বগতভাবে অভিনবগুপ্তের মতে এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক কোনো বিরোধ নেই।
এই দৃষ্টিকোণ
থেকে বিচার করলে দেখা যায়, অভিনবগুপ্তের ঝোঁক স্পষ্টভাবে রসের দিকেই। তাঁর কাছে কাব্যের
চূড়ান্ত লক্ষ্য হল রসানুভূতি। ধ্বনি সেই রসানুভূতিরই মাধ্যম।
রসের
স্বরূপ ও অভিব্যক্তিবাদ
রসের উৎপত্তি ও নিষ্পত্তি সম্পর্কে অভিনবগুপ্ত
পূর্ববর্তী তিনটি মতকে গ্রহণ করেননি। উৎপত্তিবাদ, অনুমিতিবাদ ও ভুক্তিবাদ এই তিনটির
পরিবর্তে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন অভিব্যক্তিবাদ। তাঁর মতে রস তৈরি হয় না, অনুমান করেও
পাওয়া যায় না, কিংবা ভোগ্য বস্তু হিসেবেও তা নয়। রস মূলত অন্তর্নিহিত থাকে এবং কাব্যের
মাধ্যমে তা অভিব্যক্ত হয়।
তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, বাস্তব জীবনের ভাব, সেই
ভাব জাগ্রত হওয়ার কারণ ও তার কার্য কবি শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। এই প্রকাশ কবিবর্ণিত
ব্যভিচারী ভাবের সাহায্যে বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত রসাত্মক বাক্যে রূপ
নেয়। শব্দে প্রকাশিত হয়ে লৌকিক ভাব অলৌকিক আনন্দে রূপান্তরিত হয়। তাঁর মতে রস হল আনন্দময়
সম্বিতের আস্বাদন।
রসধ্বনির
ধারণা
অভিনবগুপ্তের মতে যেখানে ব্যঙ্গার্থ অলক্ষ্যক্রমে
নয়, বরং প্রত্যক্ষভাবে রসকে জাগ্রত করে, সেখানেই রসধ্বনি বিদ্যমান। অর্থাৎ ধ্বনি তখনই
শ্রেষ্ঠ হয়, যখন তা সরাসরি রসানুভূতির জন্ম দেয়। এই ভাবনাই রসবাদ ও ধ্বনিবাদের মধ্যে
সেতুবন্ধন রচনা করেছে।
পূর্ববর্তী
রসতাত্ত্বিকেরা
ভরত থেকে ধ্বনিবাদ প্রতিষ্ঠার পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত
কিছু আচার্য রসবাদকে সমর্থন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে লোল্লট, শঙ্কুক, নায়ক ও রুদ্রভট্টের
নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁরা মূলত ভরতের নাট্যশাস্ত্রের টীকাকার হিসেবে পরিচিত। দুর্ভাগ্যবশত
প্রথম তিনজনের মূল গ্রন্থ পাওয়া যায় না। অভিনবগুপ্ত ও মন্মট তাঁদের মত খণ্ডন করতে গিয়ে
যে আলোচনা করেছেন, তার মাধ্যমেই আমরা তাঁদের মতবাদ সম্পর্কে ধারণা লাভ করি।
উপসংহার
অভিনবগুপ্ত ভারতীয় কাব্যতত্ত্বে এক অনন্য উচ্চতায়
অধিষ্ঠিত। তিনি রসতত্ত্বকে শুধু ব্যাখ্যা করেননি, বরং তার দার্শনিক ভিত্তি সুদৃঢ় করেছেন।
রসকে অলৌকিক আনন্দের স্তরে উন্নীত করে তিনি কাব্যের প্রকৃত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।
রসবাদ ও ধ্বনিবাদের সমন্বয়ে তাঁর অভিব্যক্তিবাদ ভারতীয় সাহিত্যসমালোচনাকে এক গভীর ও
স্থায়ী দিশা দিয়েছে। ছাত্রদের কাছে অভিনবগুপ্ত তাই শুধু একজন তাত্ত্বিক নন, বরং কাব্যবোধের
এক অপরিহার্য পথপ্রদর্শক।

কোন মন্তব্য নেই
ok