Translate

বনফুলের ছোটোগল্প , সম্পাদক: ড. নীলোৎপল জানা

 




                                                বনফুলের ছোটোগল্প

 ডাক্তার বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় 'বনফুল' ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। পরবর্তীকালে তিনি যখন সাহিত্যসাধনায় আত্মনিয়োগ করে 'সহস্রদল পদ্মের মতো বিকশিত হয়ে উঠলেন তখনো তিনি বনফুল হয়েই রইলেন।' বাংলা সাহিত্যের আসরে তিনি এক নিরলস, বিচিত্রকর্মা, প্রচণ্ড প্রাণশক্তিসম্পন্ন লেখক। জগদীশ ভট্টাচার্য খুব সুন্দরভাবে বলেছেন-'কাব্যে নাটকে উপন্যাসে ছোটগল্পে তাঁর সৃষ্টিকর্ম যেমন অক্লান্ত, তাঁর জীবনজিজ্ঞাসাও তেমনই অন্তহীন।' শিল্পসৃষ্টিতে কোনো নির্দিষ্ট ফর্মে আবদ্ধ থাকা তাঁর ধাতে ছিল না। বনফুলের ছোটোগল্প নিয়ে আলোচনায় আসার আগে তাঁর লেখা কয়েকটি বিখ্যাত উপন্যাসের নাম উল্লেখ করছি- 'তৃণখণ্ড', 'বৈতরণী-তীরে', 'কিছুক্ষণ', 'অগ্নি', 'স্বপ্নসম্ভব', 'সপ্তর্ষি', 'জঙ্গম', 'ডানা' ইত্যাদি। ১৯২২ সালে প্রকাশিত 'পাখি' লেখাটিকে বনফুলের প্রথম ছোটোগল্প হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তাঁর মোট ছোটোগল্পের সংখ্যা ৫৭৮ এবং গল্পগ্রন্থের সংখ্যা ৩৪টি। এত বিপুল সংখ্যক আখ্যানরচনা আমাদের বিস্মিত করে। 'গল্প লেখার গল্প'-এ তিনি বলেছেন-

"গল্প কি কৌশলে লিখি তা আমি নিজেই জানি না। আকাশে যেমন মেঘ ভেসে আসে, গাছে যেমন ফুল ফোটে, তেমনি গল্পও মনে আপনি জাগে। একটি বিশেষ মুহূর্তে কেন একটা গল্পের প্লট হঠাৎ মাথায় আসে তা বলা খুব শক্ত। আমার মনে হয় যিনি আসলে গল্পলেখক তিনি নেপথ্যে বাস করেন। তার যখন গল্প বলার ইচ্ছে হয়, তিনি আমাকে দিয়ে গল্পটা লিখিয়ে নেন। এটুকু বলতে পারি, গল্পের প্লটটা হঠাৎ মাথায় আসে। এবং কে যেন ঘাড় ধরে সেটা লিখিয়ে নেন। কে সেই নেপথ্যবাসী জানি না। সমাজে যখন ঘোরাফেরা করি তখন নানারকম নরনারী দেখতে পাই, তাদের ছাপ আমার মনের ওপর পড়ে। শুধু পড়ে না, কল্পনারসে জারিত হয়ে সেগুলি চিত্ররূপে রাখা থাকে আমাদের মনের অবচেতন লোকে। এই নেপথ্যবাসী কবি যখন গল্প সৃষ্টি করতে চান তখন সেই চিত্রশালা থেকেই তিনি সংগ্রহ করেন। তিনি খেয়ালী কবি।... মনের নেপথ্যবাসী সেই কবিসত্তার মর্জির উপরই নির্ভর করতে হয় আমাকে। তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় জানি না। ....তাঁকে উপেক্ষা করে পরের ফরমাসে জোর করে যখন লিখতে যাই, গল্প উতরোয় না।

 

কি যেন একটা অভাব থেকে যায়। কৌশল করে প্লট ভেবে ছক এঁকে, অঙ্ক কষে প্রথম শ্রেণীর গল্প লেখা যায় না। প্রথম শ্রেণীর গল্প বিদ্যুৎচমকের মতো, স্বতঃস্ফূর্ত শতদলের মতো। যখন হয় আপনিই হয়। সেই বিদ্যুৎ চমকের বা শতদলের রূপটিকে ভাষায় রূপান্তরিত করার নিপুণতাতেই লেখকের কৃতিত্ব। মনে রাখা উচিত অনাবশ্যক বাগাড়ম্বরে শিল্পের সুষমা নষ্ট হয়।"

 

উপরি-উক্ত অংশ থেকে ছোটোগল্পকার বনফুলের মেজাজ ও মনোবীজের সন্ধান পাওয়া গেল। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, অতি-সংক্ষিপ্ত আকারের গল্পগুলির জন্যই তিনি অধিক বিখ্যাত। 'বাড়তি মাশুল' গল্পে দেখি, হারানো ছেলের মুখের সাদৃশ্য দেখে বাবা ভুল লোকের পেছনে ধাবিত হয় এবং নিজের গন্তব্য ছেড়ে অনেক দূরে চলে যায়। নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে যখন ট্রেনে ফেরে তখন তাকে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়-'শুধু টাকার নয়, এ যে দুঃখস্মৃতি মনে পড়ারও বাড়তি মাশুল, তাতে সন্দেহ থাকে না।' গল্পশেষের তীব্র অভিঘাত বনফুলের গল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

 

বনফুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু পরিমল গোস্বামী লিখেছিলেন-

 

"তুমি বিজ্ঞানী ও কবি-তোমার গল্পে এ দুয়ের অদ্ভুত মিলন ঘটেছে। তার ফলে শিল্পীর নিস্পৃহতার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক নিস্পৃহতা মিলে তোমার দৃষ্টিভঙ্গীকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে।"

 

এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, তাঁর ডাক্তারি মন ও চিকিৎসকের জীবন অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে আছে বহু গল্পে। যেমন- 'বিনোদ ডাক্তার', 'শরীর মন ও মানুষ', 'তর্ক ও স্বপ্ন', 'প্রস্তর সমস্যা' ইত্যাদি। 'মানুষের মন' গল্পে দেখা যায় নরেশ ও পরেশ দুই ভাইকে। একজন বৈজ্ঞানিক, অন্যজন বৈষ্ণব। দুজনেই নিজের আদর্শে অবিচল। তাদের একটাই মিল- তারা ভাইপো পল্টুকে সমানভাবে ভালোবাসে। পল্টুর টাইফয়েড হওয়ার পর বৈজ্ঞানিক অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার শরণাপন্ন হল, অন্যদিকে বৈষ্ণব গেল কবিরাজের কাছে। ইনজেকশন কিংবা চরণামৃত-- কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। গল্পের শেষে দেখা যায় মৃত্যুর হাত থেকে স্নেহাস্পদকে বাঁচাবার জন্যে 'বৈষ্ণব-ভক্ত বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাতেই শেষ আশ্রয় খুঁজছেন, আর বৈজ্ঞানিক চরম ভরসা স্থাপন করতে চাইছেন চরণামৃতের মাহাত্ম্যের ওপর'। মানবমনের কী অপার রহস্য।

বনফুলের ছোটোগল্পের কয়েকটি সংকলনের নাম বলা যেতে পারে-'ঊর্মিমালা', 'অনুগামিনী', 'সপ্তমী', 'মণিহারা', 'এক ঝাঁক খঞ্জন', 'বহুবর্ণ', 'বনফুলের নতুন গল্প' ইত্যাদি।

'পরিবর্তন' গল্পে পাই দাম্পত্য ট্রাজেডির নিষ্ঠুর বৃত্তান্ত যক্ষ্মারোগাক্রান্ত হরিমোহনের স্ত্রী সরমা তার পতিকে নিঃস্বার্থভাবে সেবা করছে। যেদিন সরমা বুঝতে পারল তার স্বামীর বাঁচার সম্ভাবনা কম, সে এক অদ্ভুত আচরণ করে বসল। হরিমোহনের উচ্ছিষ্ট দুধ গোপনে সে খেয়েছে-এটা ডাক্তারের চোখে ধরা পড়ল। সরমার যুক্তি ছিল- স্বামী না বাঁচলে তার বেঁচে থেকে কী লাভ? যাইহোক, সরমা যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হল এবং মারা গেল। এদিকে হরিমোহন সুইজারল্যান্ডে গিয়ে সুস্থ হল এবং দেশে ফিরে এসে আবার বিয়ে করল। পতিব্রতা স্ত্রীর কথা ভেবে একই নামের মেয়েকেই বেছে বেছে নির্বাচন করল। সত্যি পতিব্রতার কী নিদারুণ পরিণতি। সামাজিক স্যাটায়ারধর্মী গল্পতে বনফুল সফল। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে 'ভাগ্য পরিবর্তনের ইতিহাস' গল্পটির কথা। বনফুলের 'হাসির গল্প'-র নায়ক হরিহর নিজেই অসুস্থ, মেয়ে রোগশয্যায়, পাওনাদাররা অশান্তি করছে; তার মধ্যে হাসির গল্পের প্লট ভাবছেন। লিখতেই হবে। সম্পাদক তাগাদা দিচ্ছে। হাসির গল্প এখানে করুণ রসের অবতারণা করছে।

 

বনফুলের অতিলৌকিক গল্প রচনার মুন্সিয়ানা বোঝা যায় 'অধরা' গল্পটি থেকে। সারাদিন গল্পের কথক চখা শিকারের চেষ্টা করছেন। ডাক শোনা যাচ্ছে 'কাঁআঁ', কিন্তু ধরা যাচ্ছে না। রহস্যের পরিবেশ ঘনিয়ে উঠেছে গল্পে। সমালোচক দেবদ্যুতি বন্দ্যোপাধ্যায় বনফুলের গল্পের একটি বিশেষ দিককে নির্দেশ করেছেন-

          "বস্তুত সুকুমার, দুর্বল, অসহায় অস্তিত্বের প্রতি লেখকের করুণা বিভিন্ন ছোটগল্পে মুক্তিলাভ করেছে। এবিষয়ে 'একফোঁটা জল' (মায়ের জায়গায় যেখানে 'মঙ্গলা গাই'-কে বসানো হয়েছে।), 'আত্মপর' (পাখির ভ্রূণ যেখানে নিয়তিরূপে আবির্ভূত), 'খেদি' (জন্মলগ্ন থেকেই পিতৃমাতৃহীন), 'খেঁকি' (ঘেয়ো রাস্তার কুকুর এই গল্পের প্রধান চরিত্র), 'গণেশজননী' (হাতিকে যেখানে নিঃসন্তান দম্পতি সন্তানস্নেহে পালন করেছে) প্রভৃতি গল্পের কথা স্মরণীয়।"

মিতভাষণ যে বনফুলের গল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, সেকথা আমরা জানি। যে গল্পের কথা না বললে আমাদের আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে; সেটি হল 'নিমগাছ'--

 

"কেউ ছালটা ছাড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধ করছে। পাতাগুলো ছিঁড়ে শিলে পিষছে কেউ। কেউ বা ভাজছে গরম তেলে।... কচি ডালগুলো ভেঙে চিবোয় কত লোক-দাঁত ভালো থাকে।... হঠাৎ একদিন একটা নতুন ধরনের লোক এল। ছাল তুললে না; পাতা ছিঁড়লে না, ডাল ভাঙলে না, মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল শুধু।... নিমগাছটার ইচ্ছে করল লোকটার সঙ্গে চলে যায়। কিন্তু পারলে না। মাটির ভিতর শিকড় অনেক দূরে চলে গেছে। বাড়ির পিছনে আবর্জনার স্তূপের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইল সে।”

   বিশুদ্ধ একটি নিমগাছের গল্প পাল্টে গেল উপসংহারে এসে-'-ওদের বাড়ির গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্মী বউটির ঠিক এই দশা।' শেষ বাক্য থেকে শুরু হল গল্পটির দ্বিতীয় পাঠ। পাঠকের মন পড়ে রইল লক্ষ্মী বউয়ের করুণ জীবনের অকথিত কাহিনীতে। আর এইভাবেই বনফুলের গল্পবিশ্ব হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক, অনেকার্থদ্যোতক। সংক্ষিপ্ত পরিসরে ধরা থাকে অপরিসীম ব্যঞ্জনা

বনফুলের ছোটোগল্পের ৫টি প্রধান বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ—

  1. অতি-সংক্ষিপ্ততা (Brevity)
    বনফুল খুব অল্প পরিসরে গল্প নির্মাণ করেছেন। অল্প কথায় গভীর জীবনসত্য ও মানবমনের জটিলতা প্রকাশ করা তাঁর গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
  2. চমকপ্রদ ও তীক্ষ্ণ উপসংহার
    তাঁর গল্পের শেষে আকস্মিক মোড় বা তীব্র অভিঘাত সৃষ্টি হয়, যা পাঠককে নতুনভাবে গল্পের অর্থ উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। যেমন— ‘বাড়তি মাশুল’‘নিমগাছ’
  3. মানবমনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ
    মানুষের মনস্তত্ত্ব, আবেগ, দ্বন্দ্ব ও আচরণের রহস্যময় দিক তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। ‘মানুষের মন’ গল্প তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
  4. ব্যঙ্গ ও সামাজিক সমালোচনা
    সমাজের কুসংস্কার, ভণ্ডামি, বৈষম্য ও অসঙ্গতিকে তিনি সূক্ষ্ম ব্যঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। ‘পরিবর্তন’‘ভাগ্য পরিবর্তনের ইতিহাস’ এ ধরনের গল্প।
  5. গভীর ব্যঞ্জনা ও বহুমাত্রিকতা
    গল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকে বৃহত্তর অর্থ ও জীবনদর্শন। সংক্ষিপ্ত পরিসরেও তাঁর গল্প বহুস্তরীয় অর্থবহ হয়ে ওঠে, যেমন ‘নিমগাছ’ গল্পে।



-------
লেখক: অধ্যাপক ড. দেবায়ণ চৌধুরী
সম্পাদক: ড. নীলোৎপল জানা

কোন মন্তব্য নেই

ok

4x6 থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.