Translate

লোকনাটক ড. নীলোৎপল জানা

 


লোকনাটক

ড. নীলোৎপল জানা

বাংলাভাষা ও সাহিত্য বিভাগ

মহিষাদল গার্লস কলেজ

==========================================

    ভরতের নাট্য শাস্ত্রে বলা হয়েছে-'লোকবৃত্তানুকরণংনাট্যম্' অর্থাৎ নাটক হল লৌকিক কাহিনির অনুকরণ। আদি পর্বে-'বুদ্ধনাটক' প্রচলনের কথা আছে। মধ্যযুগে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনেও নাটগীতির প্রসঙ্গ আছে।

ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেছেন-

             "লোকনাট্য লোকজীবনের কাহিনির উপর ভিত্তি করে মুখে মুখে রচিত এবং অভিনীত নাটক। কোনো পৌরাণিক কিংবা ঐতিহাসিক কাহিনি তার ভিতরে প্রবেশ করা সঙ্গত নয়, তার কাহিনিতে পূর্ববর্তী কোনো ধারা কিংবা ঐতিহ্যও থাকে না।" ('বাংলার লোকসংস্কৃতি')

ছড়া যতটা প্রাচীন, ধাঁধাতে যতটা বুদ্ধিদীপ্তি আছে লোকনাট্য ততটাই মনোরঞ্জক শিল্পরূপ। লোকনাটকের বিষয়বস্তুর কথা বলতে গিয়ে ড. মযহারুল ইসলাম তাঁর 'ফোকলোর পরিচিত ও পঠন-পাঠন' গ্রন্থে বলেছেন-

              "লোকনাটকে মূলত প্রাচীন লোককাহিনির ঐতিহাসিক, কিংবদন্তী মূলক বা ধর্মীয় কাহিনিগুলি বিষয়বস্তু হিসেবে গৃহীত হয়।"

কিছু জনপ্রিয় লোকনাট্য হল-বীরভূমের লেটো, মুর্শিদাবাদের আলকাপ, মালদহের-গম্ভীরা, পশ্চিম দিনাজপুর ও জলপাইগুড়ির-খন ও পালাটিয়া।

               ড. নির্মলেন্দু ভৌমিক প্রদত্ত সংজ্ঞাটি হল- "Myth Rituals মিলিত হয়ে কোনও সংহত লোকগোষ্ঠীর মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, তারই নাট্যরূপ হল লোকনাট্য।" লোকনাট্য সম্পর্কে ড. বরুণকুমার চক্রবর্তী বলেছেন-

               "লোকনাট্য লোকজীবনের কাহিনির উপর অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ভরশীল, কারণ তবেই তা সংহত সমাজের কাছে আদৃত হয় বহুল পরিমাণে, নিজেদের সমাজে অনুষ্ঠিত কোনো ঘটনার প্রতিফলন যখন তারা নাটকে দেখে, তখন তা বিশেষ আগ্রহের সঞ্চার করে দর্শকসমাজে নিঃসন্দেহে।" ('বাংলা লোকসাহিত্যচর্চার ইতিহাস')

 

লোকনাটকের বৈশিষ্ট্য

১. লোকনাট্যের উদ্ভব লোকমুখে বলে এর লিখিত রূপ হয় না। লোকমুখে প্রচার ও প্রসার ঘটে।

২. এই নাট্যের স্রষ্টা ও শিল্পী সকলেই লোকায়ত স্তরের মানুষ।

৩. এই নাট্যে শিখিত নয় বলেই অপরিকল্পিত, তাই পরিকাঠামো সুনির্দিষ্ট নয়।

8.এই ধরনের নাট্য শহর থেকে দূরে অর্থাৎ গ্রামে এগুলো অভিনীত হয়।

৫.এই নাট্যে আঞ্চলিকতার ছাপ স্পষ্ট।

৬. লোকনাট্যে নাট্যমঞ্চ থাকে না বলে দর্শক ও অভিনেতার আসন একই এবং রুচির ক্ষেত্রেও পার্থক্য থাকে না।

৭. লোকনাট্যে সাজ-সজ্জার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

৮. লোকনাট্যে মূলত লোকধর্ম, নীতিশিক্ষা প্রাধান্য পায়।

৯. লোকনাট্যে সংলাপ যেমন ছোটো কাহিনিও ছোটো।

১০. এই ধরনের নাট্যে সংগীত প্রাধান্য পায়।

১১. লোকনাট্যে আবহসংগীত গুরুত্বপূর্ণ নয়।

১২. লোকনাট্যে স্ত্রী লোক কম বা থাকে না বরং পুরুষরাই স্ত্রী রূপে সাজ-সজ্জা করে।

১৩. লোকনাট্যে যে বাদ্য ব্যবহৃত হয় তা মূলত লোকবাদ্য।

 

 লোকনাটক 

   লোকনাট্যগুলো বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে বিশেষ নামে পরিচিত। বিষয়ের সামান্যতম পরিবর্তনের মাধ্যমে লোকনাট্যগুলো লোকসমাজে জনপ্রিয় হয়। এমন কয়েকটি জনপ্রিয় লোকনাট্য হল-গম্ভীরা, আলকাপ, বিষহরা, বনবিবির পালা, কৃষ্ণযাত্রা, লেটো, ভাঁড়যাত্রা, খন, চোর-চুরনী পালা, কুশান, বোলান ইত্যাদি।

 আলকাপ

মুর্শিদাবাদ ও সন্নিহিত জেলাসমূহের জনপ্রিয় লোকনাট্য আলকাপ। 'আলকাপ' শব্দটি ব্যঞ্জনাধর্মী। আল শব্দের অর্থ কণ্টক, সীমানা, কীলক, হুল ইত্যাদি। আর কাপ শব্দের অর্থ -কৌতুককারী ছদ্মবেশী, তামাসা, সঙ ইত্যাদি ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে 'কাপ' শব্দটি পাওয়া যায় শিবের ভিক্ষা যাত্রা অংশে। 'কাপ' শব্দটির উৎপত্তি কাপট্য থেকে, যার অর্থ -ছদ্মবেশী বা কৌতুক।

আলকাপ পূজা-অনুষ্ঠানে নিরপেক্ষ একটি লোকনাট্য যার অভিনয়ের কোনো সময় নির্দিষ্ট নেই। তবে অনুকূল প্রাকৃতিক সময়ে এর অভিনয় হয়। বিশেষ করে দুর্গাপূজার পর থেকে আলকাপের আসর শুরু হয় এবং গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত নানা স্থানে আলকাপের অনুষ্ঠান হয়। কোনো স্থানে মাসাধিক কাল পর্যন্ত আলকাপের অনুষ্ঠান হয়। গ্রামীণ এলাকায় আমন ধান উঠে গেলে এই অভিনয় হয়।

আলকাপ দল গঠিত হয় ছড়াদার, ছোকরা, কপ্যা সাধারণ অভিনেতা, বাজনদার, দোহারকি প্রমুখের সমন্বয়ে। এই দলে যিনি ছড়া কাটেন, কাপ, পালা রচনা করেন তাকেই

ছড়াদার বা মাস্টার বলা হয়। কেউ কেউ খলিফাও বলেন। দুই দলের প্রতিযোগিতামূলক আসরে মাস্টার বা খলিফাই হল দলের প্রধান। এই দলে যিনি কাপ অংশে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তাঁকে বলে সঙ্দার। এই দলের নারীবেশী পুরুষদের অভিনেতা বা গায়কদের বলা হয় 'ছোকরা'। অর্থ-সামাজিক দিক থেকে আলকাপ দলের শিল্পীরা মূলত নিম্নবর্ণের হিন্দু বা মুসলমান। অধিকাংশই নিম্নবিত্ত বা দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। যখন পালা বন্ধ থাকে তখন তারা খেতমজুর, ফেরিওয়ালা, বা রিক্সা চালায়। বর্তমানে বেকারত্বের কারণে বহু শিক্ষিত যুবক বাণিজ্যিক ভাবে নেমে পড়েছেন।

এই পালার শ্রোতারাও মূলত আর্থ-সামাজিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষ। বর্তমানে গ্রামের নানান অনুষ্ঠানে এই পালা অনুষ্ঠিত হচ্ছে; তাই শিক্ষিত, অশিক্ষিত উভয় শ্রেণির মানুষ এই পালা দর্শনে উপস্থিত হচ্ছেন।

আলকাপ পালায় তেমন পোশাক ব্যবহারের রীতি নেই তবে রাজা বা জমিদার চরিত্রের পোশাক একটু অন্য ধরনের। কোনো কোনো পালায় মুখোশ ব্যবহারের রীতি আছে।

এই ধরনের লোকনাট্যে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার তেমন নেই, যা আছে লোকবাদ্য। ঢোল, তবলা, বাঁয়া, হারমোনিয়াম, কনসাট, বাঁশি ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়।

    আলকাপের বিষয় মূলত পারিবারিক বিরোধ, সতীনের ঝগড়া।

 গম্ভীরা

অভিধানে গম্ভীরা শব্দের যে অর্থই থাক না কেন, নৃত্য-গীত সম্বলিত শিবের পূজাকে গম্ভীরা বলা হয়। মালদহের গম্ভীরা বৎসরের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হয়। ধরা হয় বা অনুমান করা হয় শৈব ধর্মের প্রভাবে শিবপূজা গম্ভীরা পূজায় পরিণত হয়েছে। যশোহর, খুলনা অঞ্চলে গাজনের শিবের ঘরকে 'গম্ভীরা ঘর' বলা হত।

এই গম্ভীরা মালদহের সমস্ত থানাতে অনুষ্ঠিত হয়। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে গম্ভীরা পূজা দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে। লোকমত অনুযায়ী ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে দুর্গাপূজার মতো মালদহে গম্ভীরা পূজা ধূমধাম করে হত।

গম্ভীরা গান আদরণীয় জেলা ও জেলার বাইরে। গম্ভীরা গানের ঢঙ যাত্রার আকারে। তাই একে পালাগান বলা উচিত। প্রায় ১২-১৬ ফুট ব্যাসযুক্ত গোলাকার অংশকে আসর করে চারদিকে বৃত্তাকারে শ্রোতা বা দর্শকেরা ভূমি-আসন গ্রহণ করত। ওপরে সামিয়ানা টাঙানো হত। একটু দূরে থাকে সাজঘর। আসরের একদিকে বসত বাজিয়ে এবং গায়কেরা। বাদ্যযন্ত্র হল-হারমোনিয়াম, ডুগি, তবলা, বাঁশি ও জুড়ি।

গম্ভীরা পালা গানের কয়েকটি অংশ হল মুখপাদ, বন্দনা, ডুয়েট, পালাবন্দী, রিপোর্ট। গম্ভীরার ভাষা হল আঞ্চলিক।

 

লেটো

বঙ্গীয় লোকসংগীতের বিভিন্ন শাখার অন্যতম উপশাখা হল লেটোগান। এক সময় এই গান, বর্ধমান, বীরভূম, হাওড়া, হুগলি, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ায় জনপ্রিয় ছিল। লেটো শব্দের অর্থ হল-হাস্যরসাত্মক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গীতিনাট্যর অভিনয়। আরো জানা যায় লেটো শব্দের মূল অর্থ হল নড়া-চড়া বা অঙ্গচালনা। তাই বলা চলে নাটকের বিকৃত তদ্ভব রূপ 'লেটো'। (নট-নাট্য-নাটক: ড. সুকুমার সেন)

লেটো গানের অনুষ্ঠানের সময়কে দুভাগে ভাগ করা যায়-

   প্রথমত, শীতকাল থেকে গ্রীষ্মকাল। দ্বিতীয়ত, এই গানের অভিনয় শুরু হয় সন্ধ্যার পর-একটু রাত হলে, গান চলে ভোর পর্যন্ত। ছোটোবড়ো মেলার অন্যতম আকর্ষণ লেটো গান। কেটে নেওয়া ধান জমিতে বসত গ্রাম্য মেলা। মেলার মাঝখানে বড় সামিয়ানা টাঙানো হত। পাশেই তৈরি করা হত সাজঘর। এই দলে ছেলেরা মেয়ে সেজে অভিনয় করত। পোশাকে তেমন চাকচিক্য ছিল না, মূলত পোশাক ছিল আটপৌরে শাড়ি, ধুতি, জামা, ব্লাউজ, সায়া রাজা রানী, মন্ত্রী, সেনাপতির পোশাক। নকল ঢাল, তলোয়ার, খাঁড়া, তির ধনুক, বর্ষা, লাঠি ব্যবহারের রীতি ছিল। মেকাপের জন্য বাজার থেকে আনা কোনো দামি স্নো-পাউডার ব্যবহৃত হত না।

লেটো গানের জন্য যে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়, সেগুলি হল-হারমোনিয়াম, বাঁয়াতবলা, ডুগি, জুড়ি, ঝাঁঝ বাঁশি, বঙ্গ, ঢোলক, ঘুঙুর ইত্যাদি।

লেটোগানের কুশীলবরা এই বঙ্গভূমির সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। চাষি, মজদুর, রাখাল প্রমুখ। দিনের বেলায় এরা কেউ রাখাল, কেউ মজুর, কেউ মাটি কাটার কাজ করে আর সন্ধ্যার সময় পালাগানের কুশীলব হিসাবে অংশ নেয়।

 

                                          লোকনাটক

                                              

                আনুষ্ঠানিক                                          অনানুষ্ঠানিক

               ১. গম্ভীরা                                              ১. বনবিবির পালা

               ২.শীতলামঙ্গল                                      ২. আলকাপ

               ৩.মনসামঙ্গল                                       ৩. চোরচরনী

               ৪.চণ্ডীমঙ্গল                                         ৪. খন

               ৫.শিবায়ন                                           ৫. লেটো                                   

                                                                         ৬. কুশান

                                                                         ৭. সীতাচুরি

 


কোন মন্তব্য নেই

ok

4x6 থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.