জীবনানন্দ দাশ 'বোধ' কবিতা
'বোধ' কবিতা
=================
আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে;
স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে,
সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে হয়।
সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে।
কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে
সহজ লোকের মতো; তাদের মতন ভাষা কথা
কে বলিতে পারে আর; কোনো নিশ্চয়তা
কে জানিতে পারে আর? শরীরের স্বাদ
কে বুঝিতে চায় আর? প্রাণের আহ্লাদ
সকল লোকের মতো কে পাবে আবার।
সকল লোকের মতো বীজ বুনে আর
স্বাদ কই, ফসলের আকাঙ্ক্ষায় থেকে,
শরীরে মাটির গন্ধ মেখে,
শরীরে জলের গন্ধ মেখে,
উৎসাহে আলোর দিকে চেয়ে
চাষার মতন প্রাণ পেয়ে
কে আর রহিবে জেগে পৃথিবীর ’পরে?
স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—কোন্ এক বোধ কাজ করে
মাথার ভিতরে।
পথে চ’লে পারে—পারাপারে
উপেক্ষা করিতে চাই তারে;
মড়ার খুলির মতো ধ’রে
আছাড় মারিতে চাই, জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে
তবু সে মাথার চারিপাশে,
তবু সে চোখের চারিপাশে,
তবু সে বুকের চারিপাশে;
আমি চলি, সাথে-সাথে সেও চ’লে আসে।
আমি থামি—
সেও থেমে যায়;
সকল লোকের মাঝে ব’সে
আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা?
আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?
আমার পথেই শুধু বাধা?
জন্মিয়াছে যারা এই পৃথিবীতে
সন্তানের মতো হ’য়ে—
সন্তানের জন্ম দিতে-দিতে
যাহাদের কেটে গেছে অনেক সময়,
কিংবা আজ সন্তানের জন্ম দিতে হয়
যাহাদের; কিংবা যারা পৃথিবীর বীজখেতে আসিতেছে চ’লে
জন্ম দেবে—জন্ম দেবে ব’লে;
তাদের হৃদয় আর মাথার মতন
আমার হৃদয় না কি? তাহদের মন
আমার মনের মতো না কি?
—তবু কেন এমন একাকী?
তবু আমি এমন একাকী।
হাতে তুলে দেখিনি কি চাষার লাঙল?
বাল্টিতে টানিনি কি জল?
কাস্তে হাতে কতোবার যাইনি কি মাঠে?
মেছোদের মতো আমি কতো নদী ঘাটে
ঘুরিয়াছি;
পুকুরের পানা শ্যালা—আঁশ্টে গায়ের ঘ্রাণ গায়ে
গিয়েছে জড়ায়ে;
–এই সব স্বাদ;
—এ-সব পেয়েছি আমি, বাতাসের মতন অবাধ
বয়েছে জীবন,
নক্ষত্রের তলে শুয়ে ঘুমায়েছে মন
এক দিন;
এই সব সাধ
জানিয়াছি একদিন—অবাধ—অগাধ;
চ’লে গেছি ইহাদের ছেড়ে;
ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে,
অবহেলা ক’রে আমি দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে,
ঘৃণা ক’রে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে;
আমারে সে ভালোবাসিয়াছে,
আসিয়াছে কাছে,
উপেক্ষা সে করেছে আমারে,
ঘৃণা ক’রে চ’লে গেছে—যখন ডেকেছি বারে-বারে
ভালোবেসে তারে;
তবুও সাধনা ছিলো একদিন–এই ভালোবাসা;
আমি তার উপেক্ষার ভাষা
আমি তার ঘৃণার আক্রোশ
অবহেলা ক’রে গেছি; যে-নক্ষত্র—নক্ষত্রের দোষ
আমার প্রেমের পথে বার-বার দিয়ে গেছে বাধা
আমি তা’ ভুলিয়া গেছি;
তবু এই ভালোবাসা—ধুলো আর কাদা।
মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়—প্রেম নয়—কোনো এক বোধ কাজ করে।
আমি সব দেবতারে ছেড়ে
আমার প্রাণের কাছে চ’লে আসি,
বলি আমি এই হৃদয়েরে:
সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়!
অবসাদ নাই তার? নাই তার শান্তির সময়?
কোনোদিন ঘুমাবে না? ধীরে শুয়ে থাকিবার স্বাদ
পাবে না কি? পাবে না আহ্লাদ
মানুষের মুখ দেখে কোনোদিন!
মানুষীর মুখ দেখে কোনোদিন!
শিশুদের মুখ দেখে কোনোদিন!
এই বোধ—শুধু এই স্বাদ
পায় সে কি অগাধ—অগাধ!
পৃথিবীর পথ ছেড়ে আকাশের নক্ষত্রের পথ
চায় না সে? করেছে শপথ
দেখিবে সে মানুষের মুখ?
দেখিবে সে মানুষীর মুখ?
দেখিবে সে শিশুদের মুখ?
চোখে কালো শিরার অসুখ,
কানে যেই বধিরতা আছে,
যেই কুঁজ—গলগণ্ড মাংসে ফলিয়াছে
নষ্ট শসা—পচা চাল্কুমড়ার ছাঁচে,
যে-সব হৃদয়ে ফলিয়াছে
—সেই সব।
আলোচনা
'বোধ' কবিতায় একাকিত্বের চিত্রণ
- জন্ম ও পরিবার: ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন । পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন শিক্ষক ও সমাজসেবক এবং মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন কবি, যার কাব্যপ্রতিভা জীবনানন্দকে প্রভাবিত করেছিল।
- শিক্ষা: বরিশাল ব্রজমোহন স্কুল ও কলেজ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ ও এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন ।
- কর্মজীবন: পেশাগত জীবনে তিনি মূলত ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। কলকাতা সিটি কলেজ, বরিশাল ব্রজমোহন কলেজসহ বিভিন্ন স্থানে পড়িয়েছেন, তবে আর্থিক সংকট ও চাকরির অস্থিরতা ছিল তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী।
- সাহিত্য শৈলী: জীবনানন্দের কবিতায় নির্জনতা, প্রকৃতি, সময়, মৃত্যু এবং জীবনচেতনার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ দেখা যায় । রূপসী বাংলার নিসর্গ ও বিষণ্ণতা তাঁর লেখনীর প্রধান বিষয় ।
- উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে ঝরা পালক, ধূসর পাণ্ডুলিপি, বনলতা সেন, মহাপৃথিবী, সাতটি তারার তিমির বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ।
- পুরস্কার ও স্বীকৃতি: ১৯৫৩ সালে 'বনলতা সেন' গ্রন্থের জন্য তিনি রবীন্দ্র-স্মৃতি পুরস্কার এবং ১৯৫৫ সালে (মৃত্যুর পর) 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' গ্রন্থের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান ।
জীবনানন্দ দাশের “বোধ” কবিতায় একাকিত্ব কেবল বাহ্যিক নির্জনতা নয়; বিচ্ছিন্নতা এক মানসিক ও অস্তিত্বগত অবস্থা হিসেবে ফুটে উঠেছে—যেখানে কবি ভিড়ের মাঝে থেকেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বোধ করেন যে তিনি আলাদা, অপরিচিত ও নিঃসঙ্গ। ভিড়ের মাঝে আলাদা হওয়া কবি নিজেকে সকল মানুষের মধ্যে বসে আছেন বলে মানেন, তবু জোরালো ভাষায় জিজ্ঞাসা করেন:
“সকল লোকের মাঝে ব’সে / আমার নিজের মুদ্রাদোষে / আমি
একা হতেছি আলাদা? / আমার চোখেই
শুধু ধাঁধা? / আমার পথেই শুধু
বাধা?”
এখানে কবির মনে হয়েছে যে তাঁর নিজের
চিন্তা–দৃষ্টি–বোধের বিশেষ কারণে তিনি মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন; তাঁর “চোখেই ধাঁধা”, তাঁর “পথেই বাধা”—এই দৃষ্টিভঙ্গিতে একাকিত্ব হয়ে
উঠেছে নিজের চেতনার স্বভাবজাত বিশেষত্বের প্রতিচ্ছবি।
অনিবার্য বোধের
সঙ্গীতা–বিচ্ছিন্নতা
“বোধ”—এই যে মাথার ভিতরকার অদৃশ্য চেতনা—তা কবিকে
কোনো স্বপ্ন, শান্তি বা
ভালোবাসা দেয় না; বরং সব কাজ,
চিন্তা, প্রার্থনা কেবল শূন্য মনে হতে থাকে।
“সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়, / সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময় / শূন্য মনে
হয়, / শূন্য মনে হয়।”
এই বোধ কবির সাথে
সাথে চলে; সে থামে, বোধও থামে—তাই কবির একাকিত্ব ঘুরে–ঘুরে তাঁর
মাথার চারপাশে, চোখের চারপাশে,
বুকের চারপাশে ঘনিয়ে উঠেছে। এই বোধের
কারণেই কবি “সহজ লোকের মতো” চলতে, থামতে বা কথা বলতে পারছেন না—তাই তিনি সাধারণ মানুষের মূল প্রবাহ থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা পথে হাঁটছেন।
অন্যদের সঙ্গে
তুলনায় নিজের একাকিত্ব কবি প্রশ্ন তোলেন যে, সবাই কি তাঁর মতোই এতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে? “তাদের হৃদয় আর মাথার মতন / আমার হৃদয় না
কি? তাহদের মন / আমার মনের মতো
না কি?”
তবু তিনি দেখেন যে
অন্য মানুষ চাষ, কাজ, কন্যা–কামনা, সন্তান জন্ম দেওয়াসহ সাধারণ জীবন‑বিন্দুতে মশগুল হয়ে আছে, আর তিনি—যিনি সে‑সব স্বাদ পেয়েছেন, তবু তা ছেড়ে চলে গেছেন। এই বিচ্ছেদই তাঁকে “এমন
একাকী” করে তুলেছে:
“—তবু কেন এমন
একাকী? / তবু আমি এমন একাকী।”
এখানে একাকিত্ব
সমাজবিচ্ছিন্নতা নয়, বরং
নিজের অভিজ্ঞতা ও চিন্তার গভীর অন্তর্জগতে ডুবে থাকার ফলে অন্য মানুষের কাছে
নিজেকে অস্বীকার করার মনোভাব।
ভালোবাসা, ঘৃণা ও একাকিত্বের মিশ্রণ ভালোবাসার
অভিজ্ঞতায়ও কবি একাকিত্ব অনুভব করেছেন। তিনি মেয়েমানুষকে “ভালোবাসেন”, “অবহেলা করেন”, “ঘৃণা করেন”—তাঁর প্রতি প্রেমের উত্তরে মেয়েমানুষ
আসে, তারপর উপেক্ষা করে,
ঘৃণা করে চলে যায়। এই সম্পর্কগত
অস্থিরতার মাঝে কবি বোধ করেন যে তাঁর ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত “ধুলো আর কাদা” হয়ে
গেছে।
একাকিত্ব এখানে
আরও গভীর—কেবল বিচ্ছিন্নতা নয়, ব্যর্থতা, অস্বীকৃতি ও
আত্মবিশ্বাসহীনতার মিশ্রণ। প্রেমের পথে নক্ষত্রের “দোষ” বাধা হয়ে এসেছে, তাঁর মানসিক জগতের ভেতরেই তাঁর নিজের একাকী
ভ্রমণ চলেছে।
অবসাদ, শান্তির ক্ষুধা ও গভীর একাকিত্ব কবি যখন বলেন:
“আমি সব দেবতারে ছেড়ে / আমার প্রাণের কাছে
চ’লে আসি,”
তখন তাঁর মনে হয় প্রেম বা ধর্মীয় শান্তির কোন
আশ্রয় নেই; তিনি নিজের
মনকে–নিজের হৃদয়কে–জিজ্ঞাসা করছেন কেন তা সব সময় জলের মতো ঘুরে–ঘুরে কথা বলে,
কেন তার অবসাদ নেই, শান্তি নেই, ঘুম নেই, মানুষের, মানুষীর, শিশুদের মুখ দেখে আহ্লাদ নেই।
এই
চিত্ত–বিশ্লেষণেই একাকিত্ব সবচেয়ে তীব্র হয়ে ওঠে: কবি শুধু মানুষের থেকে নয়,
তাঁর নিজের মনের গভীরতম প্রেম ও
শান্তি থেকেও বিচ্ছিন্ন বোধ করেন।
এক কথায় বলা
যায়---
“বোধ” কবিতায় একাকিত্ব এক প্রকার অন্তর্নিহিত, মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা; যেখানে কবি ভিড় ছাড়াও “একা”, স্বপ্ন ও শান্তি ছাড়াও “বোধের” জালে আবদ্ধ, ভালোবাসার ব্যর্থতায় ক্ষত‑বিক্ষত এবং নিজের মন ও প্রেমের মূল সুখ থেকে বিচ্ছিন্ন। এই একাকিত্ব যেন কবির চেতনার নিজস্ব ভাষা হয়ে উঠেছে—যা প্রাচ্য–পাশ্চাত্য মনস্তাত্ত্বিক ধারার মধ্যেও বাংলা কাব্যে জীবনানন্দের এক স্বাতন্ত্র্য রচনা করেছে।
==========================

কোন মন্তব্য নেই
ok