লোকসংস্কৃতি: প্রাথমিক ধারণা, ড. নীলোৎপল জানা
প্রথম অধ্যায়
লোকসংস্কৃতি: প্রাথমিক ধারণা
ড. নীলোৎপল জানা
প্রায়ই 'Folk'
শব্দটির অর্থ জনগণ বা সাধারণ মানুষ
ধরে নিয়ে ফোকলোরের সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যেখানে 'Lore' কে Traditional Learning হিসাবেই ধরা হয়। এর ফলে এই সংস্কৃতি নিম্নবৃত্তির,
নিম্নশ্রেণির, পল্লিবাসীদের দ্বারা লালিত বলে মনে করা হয়। যেখানে
শিক্ষিত শহুরে মানুষের প্রবেশ নিষেধ। তাই আমরা ভাবি এক সময় এই সংস্কৃতির অবলুপ্তি
ঘটবে। কিন্তু এই মতে যাঁরা বিশ্বাসী তাঁদের সঙ্গে আমার মতের মিল খুঁজে পাই না।
কারণ কোনো সংস্কৃতির সম্পূর্ণ অবলুপ্তি ঘটানো সম্ভব নয়, বরং অন্যরূপে এর প্রকাশ ঘটে। বাস্তব সময়ে দাঁড়িয়ে
আমরা এর কার্যকারিতা লক্ষ করি। অর্থাৎ বর্তমানের কোনো মডার্ন জিনিসের ভিত সেই
লোকসংস্কৃতির মধ্যে নিহিত।
তবুও প্রশ্ন জাগতে
পারে 'Folklore' তবে কী?
এর উত্তর এককথায় দেওয়া সহজ নয়।
পূর্বের ধারণা থেকে Folk (লোকা)
শব্দের অর্থ দাঁড়ায়- একই ভূখণ্ডে বসবাসকারী, ঐতিহ্য
নির্ভর, আর্থিক পরিকাঠামো,
সামাজিক মানদণ্ড একই রকম, একই রকম বিশ্বাস, সংস্কার, আচার-আচরণ উৎসব পালন, সাক্ষর-নিরক্ষর
নির্বিশেষে অবস্থান, সমভাবাপন্ন,
সংহত, ভাষাগত সমন্বয় বিদ্যমান, মানুষ।
আবার 'Lore'
(লোর) শব্দের ব্যবহৃত অর্থ হলো 'Learning
of the people'। এই প্রসঙ্গে গবেষক তুষার চট্টোপাধ্যায় মনে
করেন- "সমষ্টিগতভাবে সমাজের বা গোষ্ঠীর সামগ্রিক জীবনাশ্রয়ী কৃতিই লোককৃতি বা
লোকসংস্কৃতি (Folkore)" (লোকসংস্কৃতি পাঠের ভূমিকা-পৃঃ১১)
ড. মযহারুল ইসলাম
বলেন-"ফোকলোর এক একটি মানবগোষ্ঠীর সৃষ্টি, যারা একই ভৌগোলিক পরিবেশে বাস করে, যাদের জীবনব্যবস্থা, ভাষা, জীবিকা ও ঐতিহ্যের অবলম্বন একইসূত্রে গ্রথিত। ফোকলোর সাধারণ মানুষের সৃষ্টি,
অশিক্ষিত মানুষ মুখে মুখে এগুলো
সৃষ্টি করে-যেমন দলগতভাবে সমবেত প্রয়াসে তেমনি ব্যক্তিগতভাবে ব্যক্তিগত প্রয়াসের
সৃজিত হয়-মুখে মুখেই তা প্রচারিত ও হস্তান্তরিত হয়-পূর্বপুরুষ থেকে পরবর্তী পুরুষে,
এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে এক
দেশ বা মহাদেশ থেকে অন্য দেশ বা মহাদেশে।" (ফোকলোর পরিচিতি ও পঠন-পাঠন-২০১২,
পৃঃ ৫)
'Folklore' এর
কোনো কোনো উপাদান মৌলিকভাবে সৃষ্টি হলেও লিখিত আকারে তার প্রকাশ ঘটে। ওখানে
পুঁথিগত বিদ্যাছাড়াই প্রতিভার বিকাশ ঘটে; যেমন শিল্পসৃষ্টি যা পূর্বপুরুষ থেকে পরবর্তী প্রজন্ম, দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে তা
লিখিত ঐতিহ্যে স্থান পায়। এটা বলাই যায় Folklore হল লোক সম্পর্কিত জ্ঞান আহরণ। প্রসঙ্গত সমালোচক
তুষার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন- ".... লোকসংস্কৃতি হচ্ছে মূলত জনমানবের
ঐতিহ্যানুসারী জীবনচর্যা ও মানবচর্চার সামগ্রিক কৃতি-সাপেক্ষ বাস্তব সৃষ্টি ও মানব
সৃষ্টি এবং লৌকিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রয়োগবিদ্যা ও শিল্পকলার স্বতোৎসারিত সমষ্টিগত
অভিব্যক্তি-সাহিত্য-শিল্প-নৃত্য-গীত-অভিনয়-আচার-বিশ্বাস-ঔষধ
খাদ্য-পালাপার্বণ-ধর্মক্রিয়া-উৎসব-অনুষ্ঠান- আমোদ প্রমোদ ইত্যাদিতে যার
অভিপ্রকাশ।" (লোকসংস্কৃতির তত্ত্বরূপ ও স্বরূপ সন্ধান-পৃঃ১১১) বর্তমানে
লোকসংস্কৃতির পরিধি আরো প্রসারিত হয়েছে, যাকে বলা যায় 'আরবান
ফোকলোর'।
প্রসঙ্গ বহুমানুষ
ফোকলোর বলতে লোকসাহিত্যকে বোঝেন। বিখ্যাত গবেষক বেসকম্ Verbal Art অর্থাৎ মৌখিক শিল্প বলতে চেয়েছেন; এর ফলে শুধু লোকসাহিত্য নয় লোকসংগীতও এর
সঙ্গে চলে আসে। এছাড়া লোকশিল্প, লোকউৎসব, লোকচিকিৎসা,
লোকযান-সবই ফোকলোরের বিশিষ্ট উপাদান।
এই প্রসঙ্গে আরো কিছু কথা বলা যায়- 'লোক' মানেই গ্রামে বাসকরা
অশিক্ষিত মানুষ তা নয়, শহরের
মানুষও লোক হতে পারে। 'লোক'
কথাটি বুঝতে হবে লোকের চরিত্রে,
তার কার্যকলাপে, তার সামাজিক অবস্থা ও রুচির ভিত্তিতে। এখনো
শিক্ষিত মানুষ বাড়ি থেকে কাজে যাওয়ার সময় কালো বেড়াল দেখলে ফিরে আসেন। তার মানে
তিনি লোকবিশ্বাস মানেন। এখানে সেই ব্যক্তি শিক্ষিত, শহরে থাকলেও তিনি লোক হতে পারেন। যার মধ্যে এই
বিশ্বাস-সংস্কার কম তাকে অ-লোক বা আধুনিক মানুষ বলা যেতে পারে। তবে এই মাপকাঠি
খুবই কঠিন কাজ।
লোকসংস্কৃতি একটি
দেশের বড় বা বৃহত্তর সংস্কৃতির অঙ্গ যাকে অনগ্রসরও বলা যাবে না; আবার অপাঙ্ক্তেয়ও বলা যাবে না। 'লোক' কোনো নির্দিষ্ট স্তরে মানুষ নয়, সমাজের যে কোনো স্তরের লোক থাকতে পারে,
তা শহর বা গ্রামে। লোকসংস্কৃতি
সম্পর্কে সমালোচক ও গবেষকদের মন্তব্য-
ü
পবিত্র
সরকার- "লোকসংস্কৃতি বলতে আমরা মূলত বুঝেছি অনাগরিক সংস্কৃতিকে।
সামন্ততান্ত্রিক বা আদি সাম্যবাদী কৌম সমাজে তার জন্ম।" ('লোকভাষা লোকসংস্কৃতি')
ü
বরুণকুমার
চক্রবর্তী-"একই রূপ ভৌগোলিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক,
ঐতিহাসিক পরিবেশে বিশেষ এক জনগোষ্ঠী
যে আচার, আচরণ, জীবনচর্চা, সাহিত্য, শিল্প ও ললিতকলা ইত্যাদির ঐতিহ্যানুযায়ী অনুশীলনে স্বাভাবিক পারঙ্গমতা অর্জন
করে, তার আলোচনা, বিচার, সংরক্ষণ, চর্চা প্রভৃতিই লোকসংস্কৃতি বিজ্ঞানের বিষয়ীভূত।" (বাংলা
লোকসাহিত্যচর্চার ইতিহাস)
ü
পল্লব
সেনগুপ্ত-"জনজীবনে নানাবিধ বাস্তব বিশ্বাস, আচার সংস্কার ধারণা এবং এই সব মানব উপলব্ধির
ব্যবহারিক প্রকাশগুলি কীভাবে ঘটে, লোক-সংস্কৃতির মৌলিক উপাদানগুলির অন্বেষণের সূত্রেই তার পরিচয় পাওয়া সম্ভব।
সমাজ বিকাশের দ্বান্দ্বিক নিয়মের পরিণতিতে সুদীর্ঘ হয়ত বা স্মরণাতীতকাল আগে থেকেই
যা প্রবহমান তারই মোহনা হল সংস্কৃতি; এক্ষেত্রে লোকসংস্কৃতি" (লোকসংস্কৃতির সীমানা ও স্বরূপ)।
ü
তুষার
চট্টোপাধ্যায়-"লোকসংস্কৃতি লোকায়ত সংহত সমাজের সমষ্টিগত প্রয়াসের জীবনচর্চা ও
মানবচর্চার সামগ্রিক কৃতি; যা
মূলত তথাকথিত আদিম সমাজের অমার্জিত সাংস্কৃতিক প্রয়াস ও অগ্রবর্তী সমাজের
সুমার্জিত বিদগ্ধ সংস্কৃতি অপেক্ষা কমবেশি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র শিক্ষাগত
অতিপ্রযত্ন নিরপেক্ষ প্রধানত: ঐতিহ্যানুশ্রয়ী বাক্কাষা, অঙ্গভাষা, কারুকলা-চারুকলা, পোশাক-পরিচ্ছদ,
রান্না-বান্না, সুর, ছন্দ, ক্রীড়া, অভিনয়, ঔষধ, তুকতাক, প্রথা-উৎসব,
বিশ্বাস-সংস্কার, ধর্মানুষ্ঠান, মেলাপার্বণ ইত্যাদিতে অভিব্যক্ত।"
(লোকসংস্কৃতির তত্ত্বরূপ ও স্বরূপসন্ধান)
ü
রতনকুমার
নন্দী- "লোকসমাজের কর্মপ্রয়াসের এবং মানসপ্রয়াসের সঙ্গে সংযুক্ত সামগ্রিক
অভিব্যক্তিই লোকসংস্কৃতি"- (বিষয়: লোকসংস্কৃতি)
ü
চন্দন
খাঁ- "লোকসংস্কৃতি হল একটি সংহত সমাজের জীবনচর্যা ও মানবচর্চার সবটুকু এবং যে
সংস্কৃতি উচ্চসংস্কৃতি ও আদিম সংস্কৃতি থেকে কমবেশি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র;
ক্ষেত্রানুসারে সৃষ্টিশীল সক্রিয়তায়
মূর্ত, যে সংস্কৃতি হারানো
অতীতের মূলে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় কিন্তু অতীতের পঙ্কেই যা নিমজ্জিত নয়, বিবর্তনের ধারায় চলমানকালের সত্যের মুখোমুখি
যে সংস্কৃতি আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় তাকেই লোকসংস্কৃতি বলা যেতে পারে"
(লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্যের নানা দিক)
ü
সুজিত
মণ্ডল "কোনো একটি স্বার্থে গোষ্ঠীবদ্ধ একদল মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার
সামগ্রিক জীবনচর্চা ও মানবচর্চার একটি সংহত সামগ্রিক রূপই হল লোকসংস্কৃতি"
(লোকসংস্কৃতি দর্পণ- পৃঃ ১১)
সংজ্ঞা বিষয়ক
দীর্ঘ আলোচনাকে এক কথায় বলতে পারি লোকায়ত সমাজের শৈল্পিক প্রকাশই হল লোকসংস্কৃতি।
ফোকলোর শব্দের
বেশ কতগুলো বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া যায়
ড. মযহারুল ইসলাম কৃত Folklore-এর প্রতিশব্দ -...... লোকলোর
ড. তুষার
চট্টোপাধ্যায় ………… 'লোককৃতি'
ড. সুনীতিকুমার
চট্টোপাধ্যায় … 'লোকযান'
ড. মহম্মদ
শহীদুল্লাহ …… 'লোকবিজ্ঞান'
ড. আশুতোষ
ভট্টাচার্য ……… 'লোকশ্রুতি'
ড. সুকুমার সেন ……………… 'লোকচর্চা'
ড. নির্মলেন্দু
ভৌমিক ……… 'লোকচারণা'
ড. অরুণ রায় ……………… 'লোকায়ন'
ড. কৃষ্ণদেব
উপাধ্যায় ……… 'লোকসংস্কৃতি'
লোকসংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য
২. লোকসংস্কৃতির
মুখ্য বৈশিষ্ট্য হল বাস্তব জীবনমুখিনতা যা লোকসমাজের Real life কে তুলে ধরে।
৩. লোকসংস্কৃতির
নানান উপাদান লোকসমাজ থেকে সৃষ্টি হয় এবং লোক সমাজেই বিকাশ লাভ করে।
8. লোক সংস্কৃতিতে
গোষ্ঠী সচেতনতা বেশি, তাই যা
কিছু সৃষ্টি হয় তা ব্যক্তির নয়; গোষ্ঠীর সৃষ্টি।
৫. এই সংস্কৃতি
মূলত ঐতিহ্য সচেতন ফলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়।
৬. লোকসংস্কৃতি
লোকের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ।
৭. লোকসংস্কৃতিতে
শ্লীল-অশ্লীল বিচার হয় না।
৮. লোকসংস্কৃতির
বাকনির্ভর সাহিত্যগুলি (folk literature) নিরক্ষর মানুষের সৃষ্টি তাই পরিশীলনের ছাপ নেই।
৯. এই সংস্কৃতিতে
বাকনির্ভর বিষয়গুলি বিকাশ লাভ করে Oral midea র দ্বারা।
১০. লোকসংস্কৃতির মূলধন
হলো স্মৃতি ও শ্রুতি। এর পরম্পরা বহু কালের।
১১. লোকসংস্কৃতি
পরিবর্তনশীল; তাই
নিত্যনূতনভাবে টিকে থাকে। এ কারণে লোকসংস্কৃতি নমনীয় (fraxible)
১২. লোকসংস্কৃতির
দৃষ্টিভঙ্গি মূলত বস্তুনিষ্ঠ (objective)
লোকসংস্কৃতির শ্রেণিবিভাগ
লোকায়ত জীবনের
সামগ্রিক দিকই লোকসংস্কৃতির অন্তর্গত। কাজেই উপাদানগত দিক থেকে লোকসংস্কৃতির পরিধি
ব্যাপক। সমস্ত উপাদানের নাগাল সব সময় পাওয়া যায় না; তবুও কাজ চালানোর মতো করে লোকসংস্কৃতিকে দুভাগে ভাগ
করতে পারি-
(ক) বস্তুগত
লোকসংস্কৃতি (Materialised Folklore) (খ) অবস্তুগত লোকসংস্কৃতি (Formalised Folklore)
'ক'
ভাগের লোকসংস্কৃতি হল- বিশেষ
জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি যে সকল বস্তুকে সৃষ্টি করে তাকেই 'বস্তুনির্ভর বা বস্তুগত লোকসংস্কৃতি বলা যায়;
যেখানে লেখ্য বিষয়ের কোনো সংযোগ নেই।
অন্যপক্ষে বলা যেতেই পারে 'লোকসাহিত্য'
(Folk literature) 'অবস্তুগত
লোকসংস্কৃতি'র অন্তর্গত;
যা মুখে মুখে (Oral) প্রচারিত।
শ্রেণিবিভাগ তুলে ধরা হল-
বস্তুগত লোকসংস্কৃতি
Ø
জীবিকার উপকরণ
Ø
খাদ্য-পানীয়
Ø
বাসগৃহ
Ø
তৈজসপত্র
Ø
চিকিৎসার উপকরণ
Ø
বাদ্যযন্ত্র
Ø
পোশাক-পরিচ্ছদ প্রসাধন ইত্যাদি
বস্তুগত
লোকসংস্কৃতির এই উপাদানগুলি যে খুব মূল্যবান তা না হলেও এর গুরুত্ব অস্বীকার করার
উপায় নেই কারণ লোকজীবনের নানান দিক বস্তুগত লোকসংস্কৃতির মধ্যে ফুটে ওঠে। লোকজীবনে
প্রকৃত নান্দনিক দিক ফুটে উঠতে দেখা যায় তাদের বাসগৃহে। তারা বাসগৃহের দেওয়ালকে
নানান আল্পনায় রাঙায়, আবার
খড়ের বা পাতার ছাউনি দিয়ে গৃহকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। তারা এখনো খাটিয়া ব্যবহার
করে, ব্যবহার করে মোড়া;
বাঁশ বা বেতের চেয়ার। আবার জীবিকার
উপকরণ হিসাবে লাঙল, মাছ ধরার
যন্ত্র ইত্যাদি এখনো তারা সহজ হাতের স্পর্শ দিয়ে তৈরি করে। খাদ্য হিসাবে এখনো তারা
নানান শাক-পাতা যেমন ভক্ষণ করে, তেমনি পানীয় হিসাবে হাতে তৈরি সস্তা পানীয়ও তারা গ্রহণ করে। রান্নার হাঁড়িটা
এখনো অনেকে পোড়া মাটির ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। কেউ কেউ আবার মাটির গেলাস, মাটির থালা ব্যবহার করে থাকে। চিকিৎসার
উপকরণও খুবই সাদা-সিধে। গাছের পাতা, পোকা-মাকড় ব্যবহার করে রোগ সারাতে অভ্যস্ত। যদিও এখনো শিষ্ট সমাজে লতা-পাতা,
শিকড়-বাকড় ব্যবহার করে রোগ সারানোর
হচ্ছে। হাতে বোনা শাড়ি-জামা কাপড় ব্যবহার অতীত ও বর্তমানে চল আছে। যদিও আধুনিক
সভ্যতার প্রভাব পোশাক-পরিচ্ছদে ব্যাপক লক্ষ করা যাচ্ছে। লোকজীবনের খাদ্যাভাস তেমন
বদলায়নি। মুখরোচক খাওয়ারের প্রতি ওদের তেমন লোভ নেই,রান্না-বান্নার প্রণালীও সাবেকি। তুচ্ছ প্রসাধন এদের
কাছে অনেক দামি। বাজারের ইমিটেশন গহনা এদের চোখে সোনাকে হার মানায়। এরা সঞ্চয়ে
অভ্যস্ত নয়, প্রতিদিনের কথা
প্রতিদিনই ভাবতে পছন্দ করে। এভাবে বস্তুগত লোকসংস্কৃতির মূল্যায়ন করা যায়।
লোকসাহিত্য
লোকউৎসব
লোকধর্ম ও দেবতা
লোকক্রীড়া
লোকভাষা
লোকশিল্প
লোকনৃত্য
লোকবিশ্বাস ও সংস্কার ইত্যাদি
অবস্তুগত
লোকসংস্কৃতি প্রসঙ্গে এখানে আর সংক্ষিপ্ত আলোচনায় যাব না, একটু পরে বিস্তৃত আলোচনায় প্রবেশ করব।
আদিবাসীসংস্কৃতি ও লোকসংস্কৃতি কী একই?
নানান দিক
পর্যালোচনা করে দেখা গেছে ভারতবর্ষে মোট চারটি শ্রেণির ভাষাগোষ্ঠী অবস্থান করছে।
প্রথমত,
ইন্দো-ইউরোপীয়
দ্বিতীয়ত,
অস্ট্রিক
তৃতীয়ত,
দ্রাবিড়
চতুর্থত,
ভোটচীনীয়
প্রচলিত ধারণা
অনুসারে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ বছর পূর্বে মধ্য এশিয়া থেকে যে পশুপালক যাযাবর জাতি
ভারতে প্রবেশ করে সিন্ধু উপত্যকায় বসবাস করত তারাই 'আর্য' নামে পরিচিত হয়। এই আর্যদের সংস্কৃতি বিকাশের পূর্বে এই ভারত ভূখণ্ডে অস্ট্রিক
জাতির লোকেরা বসবাস করত, একথা
নৃ-তাত্ত্বিকগণ স্বীকার করেছেন। এদের বসতি ছিল আফ্রিকা থেকে দঃপূর্ব এশিয়া হয়ে
উত্তর ভারত পর্যন্ত। এই অস্ট্রিক জাতির লোকেদের বর্তমানে আদিবাসী সম্প্রদায় হিসাবে
চিহ্নিত করা হয়।
আর্যরা তাদের
সংস্কৃতির বিকাশ দ্রুত ঘটাতে থাকে কিন্তু আদিবাসীরা তাদের সংস্কৃতির ধার ধারে না।
বরং এরা অরণ্য সংস্কৃতির নিকট আত্মীয় হয়ে রয়েছে। এদের সংস্কৃতিকে Tribal
Culture বলা হয়। এদের সম্পর্কে বলা
হয়-
(ক) একই ভাষায় কথা
বলে মনের অভিব্যক্তি ঘটায়।
(খ) এদের জীবনে
জটিলতা নেই বললেই চলে।
(গ) এরা নানান
বিধি-নিষেধ মেনে চলে।
(ঘ) এরা আদিমতাকেই
বাঁচিয়ে রাখতে সদা সচেষ্ট।
(ঙ) এরা রক্ষণশীল
ও প্রগতিহীন সমাজের বাসিন্দা।
এই আদিবাসীর
দৃষ্টান্ত হিসাবে আন্দামানের জারোয়া জনজাতির সংস্কৃতির কথা বলা যায়। জারোয়ারা এখনো
আদিম-সংস্কৃতির লালন-পালনে আনন্দ পায়, এখনো উলঙ্গ অবস্থায় থাকতে ভালোবাসে। বাংলার পশ্চিম সীমাবর্তী অঞ্চলের
খেড়িয়ারাও এখনো গর্তে বাস করে। অনেকের ধারণা আদিবাসী সংস্কৃতি ও লোকসংস্কৃতি একই।
কিন্তু আলোচনায় স্পষ্ট হতে পারে এদের স্বরূপ।
প্রথমত,
লোকসংস্কৃতি হল উচ্চসংস্কৃতির বিকাশে
প্রথম ধাপ। আর আদিবাসীসংস্কৃতি হল লোকসংস্কৃতি বিকাশের প্রথম ধাপ।
দ্বিতীয়ত,
লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রাদেশিকতা
আছে। যেমন বাংলার লোকসংস্কৃতি অসমিয়া লোকসংস্কৃতি ইত্যাদি কিন্তু আদিবাসী
সংস্কৃতির কোনো প্রাদেশিকতা নেই। এরা একই নৃ-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
তৃতীয়ত,
লোকসংস্কৃতিতে পারিপার্শ্বিক অনুকরণ
প্রবণতা লক্ষ করা যায়, কিন্তু
আদিবাসী সংস্কৃতিতে এসব নেই, তারা
উদাসীন।
চতুর্থত,
চলমানতার প্রশ্নে লোকসংস্কৃতি চির
সবুজ কিন্তু আদিবাসী সংস্কৃতি স্থিতিশীল অর্থাৎ static।
পঞ্চমত,
আদিবাসী-সংস্কৃতি প্রথাবদ্ধ গোষ্ঠীপতি
বা মাতা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। সে ক্ষেত্রে লোকসংস্কৃতি মুক্ত, প্রভাব সঞ্জাত।
ষষ্ঠত,
লোকসংস্কৃতি আজ বিশ্বের দরবারে
পৌঁছেছে। লোকনৃত 'ছৌ' বিশ্ববাসীর মন কেড়েছে। কিন্তু
আদিবাসী-সংস্কৃতি সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
সপ্তমত,
খাদ্যবস্তু প্রস্তুতিতে আদিবাসীরা
এখনো আদিমতায় অভ্যস্ত, যেখানে
লোকসংস্কৃতি অনেকটাই নতুনকে গ্রহণ করেছে।
অষ্টমত,
বিশ্বাস ও সংস্কারের ক্ষেত্রে
লোকসংস্কৃতিতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, কিন্তু আদিবাসী সমাজে এর বিধান আছে। না পালন করলে শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়।
বর্তমানে এই বাংলার পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বেশ
কিছু আদিবাসী বসবাস করে চলেছে; যাদের সংস্কৃতির মধ্যে এখনো আদিমতা বিরাজমান। তারা উন্নত সংস্কৃতির ধারধারে না,
এখনো আদিম। যারা তপশিলি উপজাতি (Scheduled
Trible) হিসাবে পরিচিত তারা সকলে
আদিবাসী নয়; কেউ কেউ লোকসমাজের
অর্ন্তগত বলে দাবি করে থাকে।
আলোচনার শেষে একথা বলতে পারি সাধারণ সংস্কৃতিকে তিন
শ্রেণিতে ভাগ করা যায়-(ক) আদিমসংস্কৃতি (খ) লোকসংস্কৃতি (গ) উচ্চসংস্কৃতি
বস্তুগত এবং
অবস্তুগত সংস্কৃতি মিলেই লোকসংস্কৃতি গঠিত। এই দুই শ্রেণির বাইরেও শ্রেণিবিন্যাস সম্ভব
যা তুষার চট্টোপাধ্যায়ের আলোচনায় লক্ষ্য করা যায়। দুই শ্রেণির সামগ্রিক উপাদানকে মোট পাঁচটি ধারায় বিন্যস্ত করা
যায়-
১. দৈহিক ক্রিয়াধর্মী লোকসংস্কৃতি- ক্রীড়া বিনোদন, নৃত্যানুষ্ঠান ইত্যাদি বিষয়।
৩. বান্ধর্মী লোকসংস্কৃতি ছড়া, প্রবাদ, ভাষা, লোককথা, গাথা ইত্যাদি।
৪. প্রয়োগধর্মী লোকসংস্কৃতি ঝাড়ফুঁক, চিকিৎসা, ঔষধপত্র, তাবিজ কবচ, ইত্যাদি।
৫. বিশ্বাসধর্মী লোকসংস্কৃতি ধর্ম, জাদু, লোকাচার, পালা-পার্বণ, মেলা ইত্যাদি।
এই বিভাজন থেকে
বোঝা যায় যে লোকসংস্কৃতির বিষয় বহু বিচিত্র ও বহুমুখী।


কোন মন্তব্য নেই
ok