Translate

ডাকঘর নাটকে পথের ভূমিকা

 


ডাকঘর নাটকে পথের ভূমিকা

===================0====================

   রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ডাকঘর' নাটকে পথের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং জীবনের অসীমতা, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রতীক। অসুস্থ বালক অমলের ঘরবন্দি জীবনে পথটি জানালার ওপারে এক অনন্ত সম্ভাবনার দুয়ার হয়ে ওঠে। এই নাটকের মূল দ্বন্দ্ব ঘর (সীমাবদ্ধতা) ও পথ (অসীমতা)-এর মধ্যে। পথের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ মানুষের অন্তর্নিহিত মুক্তি-লালসা এবং মৃত্যুর পরলোকগামিতার দার্শনিক চিত্র তুলে ধরেন। পাশ্চাত্য দৃষ্টিকোণ থেকে এটি প্লেটোর 'অলৌকিক গুহা' (Allegory of the Cave)-এর মতো—যেখানে বন্দী অমল ছায়াময় ঘর থেকে আলোকিত পথের দিকে আকৃষ্ট হয়, অথবা কামু''অ্যাবসার্ড'-এর যাত্রায়, যেখানে পথ অর্থহীনতার মধ্যে অর্থ খোঁজার প্রতীক।

পথের প্রাকৃতিক ও সামাজিক উপস্থিতি

   নাটকের প্রথম দৃশ্যেই পথটি মাধব দত্তের বাড়ির সামনে প্রশস্ত হয়ে প্রকাশ পায়। অমলের জন্য এটি বাইরের জগতের সেতু। জানালা দিয়ে সে পথচারীদের দেখে—দইওয়ালা, প্রহরী, মোড়ল, ফকির, খঞ্জ, ছিদাম, সুধা এবং ছেলেদের দল। এরা সবাই পথের মাধ্যমে অমলের কল্পনায় প্রবেশ করে। দইওয়ালার রাঙামাটির পথ অমলকে গ্রামীণ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখায়। ফকিরের 'হালকা দেশের' গল্পে 'ভিতরের রাস্তা'র কথা শুনে অমলের অন্তর জেগে ওঠে। ছিদামের অন্ধত্ব সত্ত্বেও পথে ভিক্ষা করে জীবন উপভোগের চিত্র অমলকে অনুপ্রাণিত করে। সুধা ফুল নিয়ে পথ ধরে আসে, ছেলেরা পথেই খেলে। এভাবে পথটি সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। পাশ্চাত্যে এটি হাইডগারের 'পথের কবিতা' (Poetry of the Path)-এর মতো—যেখানে পথ (Weg) মানুষের Dasein-এর উন্মোচন করে, অর্থাৎ অস্তিত্বের প্রকাশ ঘটায়। অমলের জন্য পথ এমনই এক উন্মোচনের মাধ্যম।

 

পথের কল্পনাময় ও প্রতীকী মাত্রা

   পথ কেবল দৃশ্যমান নয়, অমলের কল্পনায় এটি অনন্ত হয়ে যায়। দূর পাহাড় পেরিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন, রাজার ডাকঘরের পথ, হরকরার বাঁকা নদী ধরে চিঠি নিয়ে আসার চিত্র—সবই পথের মাধ্যমে। অমল বলে, "পথের শেষ কোথায়, কী আছে শেষে?" এটি জীবনের রহস্যকে তুলে ধরে। পথ অনন্তের প্রতীক, যেখানে মৃত্যু শেষ নয়—তার পরে অমৃতলোকের পথ। রাজা (ঈশ্বর) পথ ধরেই অমলকে নিয়ে যাবেন। এখানে পথ হলো মাধ্যম বা উপায়—ভক্তির যাত্রাপথ। পাশ্চাত্য দর্শনে এটি ডান্তের 'Divine Comedy'-র মতো: অমলের পথ যেন 'Dark Wood'-এর পর পারাডাইসোর পথ, যেখানে মৃত্যু দিয়ে আধ্যাত্মিক মুক্তি আসে। অথবা নীৎশের 'অনন্ত পুনরাবৃত্তির পথ'—যা অমলের অনন্ত আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিলে যায়, কিন্তু রবীন্দ্রের ক্ষেত্রে এটি ঐশ্বরিক। ঘরের সংকীর্ণতার বিপরীতে পথ অসীমতা প্রতিষ্ঠিত করে।

ঘর-পথের দ্বন্দ্ব ও দার্শনিক তাৎপর্য

   নাটকে ঘর সীমাবদ্ধতা ও মৃত্যুর প্রতীক, পথ মুক্তির। অমলের অসুস্থতা তাকে ঘরে বন্দী করে, কিন্তু পথ তাকে মানসিকভাবে মুক্ত করে। এ দ্বন্দ্ব রবীন্দ্রসাহিত্যের কেন্দ্রীয় থিম—'গীতাঞ্জলি'-তে 'পথ আমার হৃদয় মাঝে'র মতো। পথের মাধ্যমে অমল সকলের সঙ্গে যোগ স্থাপন করে, যা ঐক্যবাদী দর্শন। পাশ্চাত্যে এটি সার্ত্রের 'Being-for-others'-এর বিপরীত—পথ অমলকে স্বাধীন করে। কামুর 'The Stranger'-এর মতো অমলের মৃত্যু পথের শেষ নয়, বরং নতুন যাত্রার সূচনা। রবীন্দ্রনাথ এখানে পুরাণের 'যমপথ' ও খ্রিস্টান 'পাইলগ্রিমস প্রোগ্রেস'-এর মিশ্রণ ঘটান, যেখানে পথ মোক্ষের পথ। নাটকের শেষে রাজার চিঠি পথ ধরে আসে না, কিন্তু অমল পথেই চলে যায়—আধ্যাত্মিক বিজয়।

   'ডাকঘর'-এ পথ জীবন্ত চরিত্র—অমানবীয় উপাদান হিসেবে এটি নাটকের আত্মা। এটি মানুষের অন্তর্নিহিত অসীমতা জাগায়। পাশ্চাত্য অনুসঙ্গে বলা যায়, এটি এক্জিসটেনশিয়ালিজমের পথযাত্রা (যেমন কেরকুয়েগ্রের 'On the Road') এবং ট্রান্সেন্ডেন্টালিজমের (থোরোর 'Walden Path') মিশ্রণ। রবীন্দ্রনাথের পথ ভারতীয় ভক্তি-দর্শনের সঙ্গে পাশ্চাত্য মডার্নিটির সংযোগস্থল। এর ফলে নাটক সার্বজনীন হয়।

কোন মন্তব্য নেই

ok

4x6 থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.