🌙 শেষরাতের আলো ।। নীলোৎপল জানা
ছোটোগল্প
🌙 শেষরাতের আলো
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক থেকে। বিছানার অপর পাশে
স্ত্রী ঈন্দ্রিলা ঘুমোচ্ছে—অথবা ঘুমের ভান করছে। তাদের বিছানা এখন একটাই, কিন্তু স্বপ্ন
আলাদা। একসময় হয়তো স্বপ্নটা এক ছিল, কিন্তু সময়, সংসার, অপূর্ণতা—সবকিছু একে একে আলাদা
করে দিয়েছে দুজনকে।
**
তুষার
ছোটবেলায় পাড়াগাঁয়ে বড় হয়েছে। পুকুরের পাড়ে রোদ পোহানো, মাঠে ফুটবল খেলা, বই হাতে
ঘাসের ওপর শুয়ে থাকা—এইসব তার ছোট জীবনের আনন্দ। বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক, মা
সংসারী। তখন জীবন ছিল সহজ, কিন্তু অসম্ভব সুন্দর।
কলকাতায়
ডি গ্রুপের চাকরি পেয়ে এসেছিল তুষার—মাথা ভরা স্বপ্ন নিয়ে। ভেবেছিল, জীবন বদলে
যাবে, কিছু অর্জন করবে, পরিবার গড়বে, সুখী হবে। কিন্তু বছর পেরিয়ে এখন সে শুধু এক সংসারের
ঘূর্ণির মধ্যে আটকে গেছে—অফিস, ভাড়া বাড়ি, সংসারের টানাপোড়েন আর ঈন্দ্রিলার অবিরাম
রাগ।
অফিসে বসেরা তাকে চেনে ফাইলের নিচে চাপা মানুষ
হিসেবে।
“তুষার, এই কাজটা কালকের মধ্যে শেষ করবে,”
—বসের গরম গলায় কোনো মানবিকতা নেই।
তুষার হালকা মাথা নাড়ে, “জি, করব।”
তার জীবনের প্রতিটি উত্তর এখন ‘জি’—বিপরীতে কোনো প্রশ্ন করার শক্তি সে হারিয়ে
ফেলেছে।
**
ঈন্দ্রিলা তার বিপরীত। শহরে জন্ম, উচ্চশিক্ষিতা, আত্মপ্রত্যয়ের
গর্ব তার চোখে মুখে। সংসারের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবমুখী— চাকরি, মান-সম্মান,
প্রগতি, মজাকরা। তুষারের শান্ত স্বভাব, স্থির মনন আর অস্থির জীবনে আশাবাদ তার কাছে
প্রায় অপরাধের মতো।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় তুষার
বাড়ি ফিরলে শুরু হয় কথার যুদ্ধ—
“তুমি অফিসে কী করো বলো তো? অন্যদের পদোন্নতি হচ্ছে, তোমার কবে
হবে?”
তুষার চুপ করে।
“তুমি চুপ কেন? কিছু বলো না!”
“সবাই যেমন পারে, আমি তেমন পারি না হয়তো,” তুষার মৃদু স্বরে বলে।
স্ত্রী-“পারো না! তাই তো! তোমার না-পারা নিয়ে আমি আর পারছি না তুষার!”
ঈন্দ্রিলা ঝড়ের মতো ঘরে
ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। তুষার টেবিলের পাশে বসে থাকে, মাথা নিচু করে।
তার কানে শুধু শহরের শব্দ—ট্রামের ঘন্টা, কুকুরের ডাক, গাড়ির হর্ন।
এই শব্দগুলোই এখন তার একমাত্র সঙ্গী।
**
একদিন সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার পথে তুষার পুরনো বন্ধুর দেখা পেল।
সঞ্জয়—একসময় সহপাঠী ছিল, এখন ব্যাংকে ম্যানেজারের চাকরি।
“তুই এখনও ঐ পুরনো অফিসে?” সঞ্জয়ের চোখে করুণা।
তুষার হাসল, “হ্যাঁ, এখনো ওখানেই।”
“তুই বদলাস না রে, তুষার! জীবনে কিছু করার ইচ্ছে নেই?”
তুষার হালকা হেসে বলে, “সবাই কী সব পারে বন্ধু?, কেউ কেউ একই থাকে।”
সঞ্জয় কথাটা বুঝতে পারে না। কিন্তু তুষার জানে—তার জীবন আর প্রতিযোগিতার
জন্য প্রস্তুত নয়, কেবল টিকে থাকার জন্য।
**
রাতে ঈন্দ্রিলা ফোনে
কারও সঙ্গে কথা বলছিল। হাসির শব্দ ভেসে এলো। তুষার কিছু বলে না, শুধু বসে থাকে জানালার
পাশে। বাইরে শীতের বাতাসে কুয়াশা জমে গেছে।
সে মনে মনে ভাবে—এই শহরটা
যেন তার মনেরই প্রতিরূপ, আলো আছে, কিন্তু উষ্ণতা নেই।
তার ভেতরেও কোথাও একটা আলো নিভে যেতে চায়, কিন্তু পুরোপুরি নিভে
যায় না।
হঠাৎ ঈন্দ্রিলা চেঁচিয়ে ওঠে,
“এই শুনছ? কাল সকালে বাজার থেকে সবজি ও মাংস এনে দেবে, ঠিক আছে?”
তুষার মাথা নাড়ে, “হ্যাঁ, আনব।”
“এই হ্যাঁ-হ্যাঁ করলেই তো হবে না তুষার, মানুষকে একটু প্রাণ খুলে
বাঁচতে দিতে হয়!”
তুষার কিছু বলে না। শুধু মনে মনে ভাবে, “আমার প্রাণ হয়তো নিঃশব্দই
ভালোবাসে।”
**
একদিন সকালে ঈন্দ্রিলা অসুস্থ হয়ে পড়ে। জ্বর, মাথাব্যথা, সারা শরীর
কাঁপছে। তুষার অফিসে না গিয়ে পাশে বসে থাকে। ওষুধ আনে, বার্লি করে খাওয়ায়, ঠান্ডা জলে
ভিজিয়ে রুমাল কপালে রাখে।
ঈন্দ্রিলা হালকা চোখ খুলে তাকালে—তুষারের মুখে এক অদ্ভুত শান্তি।
– “তুমি অফিসে যাওনি?”
– “না, আজ যাব না।”
– “কেন?”
– “তুমি অসুস্থ।”
ঈন্দ্রিলা চুপ করে থাকে। অনেক বছর পর তার চোখে কয়েক ফোঁট জল! একটা
অন্যরকম দৃষ্টি দেখা যায়—রাগ নেই, তুচ্ছতাও নেই, শুধু একটুখানি কৃতজ্ঞতা, হয়তো অনুশোচনা।
সন্ধ্যায় ঈন্দ্রিলা হালকা গলায় বলে,
“তুমি খুব বোকা, তুষার।”
তুষার হেসে বলে,
“বোকা বলেই হয়তো এতদিন টিকে আছি।”
ঈন্দ্রিলা কিছু বলে না। তার মুখে প্রথমবারের মতো শান্ত এক হাসি
ফুটে ওঠে।
**
রাত। তুষার আবার বিছানায় শুয়ে আছে। এবার ঘুম আসছে ধীরে ধীরে।
জানালার বাইরে আলো-আঁধারির শহরটা যেন একটু শান্ত হয়ে এসেছে।
সে ভাবে, হয়তো জীবনে সব পাওয়া যায় না, কিন্তু একটু করুণা, একটু
মমতা—এইটুকুই বেঁচে থাকার নাম।
বাতি নিভে যায়। ঘরটা অন্ধকার।
তবু কোথা থেকে যেন হালকা আলোর রেখা এসে পড়ে ঈন্দ্রিলার মুখে।
তুষার বাম হাত ঈন্দ্রিলার পিঠে রেখে চুপচাপ মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার মনে হয়, বহুদিন পর হয়তো আগামী সকালটা একটু উজ্জ্বল হবে। কোকিল আগামী বসন্তের ডাক দেবে....।
.jpg)

কোন মন্তব্য নেই
ok