গল্প: অদম্য- নীলোৎপল জানা
চতুর্থ গল্প
অদম্য
নীলোৎপল জানা
“রমা, আজও কি দুপুরে কিছু খাসনি?” — রীনা টিফিনের বাক্সটা এগিয়ে
দেয়।
রমা একটু লজ্জা পায়, “না রে… সকাল থেকে টিউশনে গিয়েছিলাম, সময় পাইনি।”
“এই নে, আমার টিফিন ভাগ করে খা। তুই না খেলে আমারও খেতে ভালো লাগবে
না রে…।”
রমা হাসতে থাকে, কিন্তু ভিতরে কোথাও একটা কাঁপন, লজ্জা , জেদ থাকে—
কবে নিজের টিফিনটা ভরে নিয়ে আসতে পারবে?
দিন যায়, রাত যায়। রমা পড়ে, কাজ করে, আবার পড়ে। অনার্স শেষ করে,
তারপর এম.এ। ভালো নম্বর পেয়ে পাস করে রমা। সে প্রায়ই কলেজের প্রিন্সিপালের সঙ্গে যোগাযোগ
রাখত কারণ তিনিই রমার বিষয়ে খেয়াল রাখতেন।
একদিন সকালে লোকাল কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে- নিজের কলেজের হস্টেলের
ওয়াড়েন লাগবে। রমা প্রিন্সিপাল কে ফোন করে জানতে চায়
সে ওয়াড়েন হতে পারবে কি’না? প্রিন্সিপাল তাকে পড়াশোনায় মন দিতে বলে কিন্তু রমা শোনে
না। সে যথা রীতি আবেদন করে এবং ইন্টারভিউতে তাকেই সিলেক্ট করা হয়। কয়েকদিনের মধ্যেই
ওয়াড়েন হিসেবে চাকরিতে জয়েন করে। যে হোস্টেলে সে নিজেই থাকতো একসময় খুব অভাবের সঙ্গে
সেই হোস্টেলেরই চাকরি নেয় রমা। চাকরির পরীক্ষার জন্য রাত জেগে পড়তে থাকে রমা।
এদিকে বাড়ির থেকে বাবা বিবাহের জন্য চাপ দিতে থাকে কারণ গ্রামের
সাধারণ মেয়ে পড়ে আর কী করবে?
এরপর কিছুদিন বাদে কলেজের অর্থনীতি বিভাগে অতিথি অধ্যাপক এর জন্য
বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। রমা যথারীতি আবেদন করে এবং ইন্টারভিউ
হয়। দুই একদিন বাদেই প্রিন্সিপাল ফোন করে জানায় রমাকে “তুমি তো এবার আমাদের
কলেজের পার্টটাইম লেকচারার হচ্ছ, রমা,” তখন সে কিছু বলতেই পারেনি। শুধু চোখে জল এসে
গিয়েছিল।
ধীরে ধীরে রমার অগ্রগতি শুরু হয়। একদিকে হোস্টেল ওয়াড়েন অন্যদিকে
অর্থনীতির অধ্যাপক; হাতে টাকা আসতে থাকে। সে তখন কলেজ সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দেয়।
দ্বিতীয়বারের পরীক্ষায় সে উত্তীর্ণ হয় এবং গবেষণার জন্য চেষ্টা করতে থাকে। এমন সময়
সে কলেজের ওয়াড়েনের চাকরি ছেড়ে দেয়।
এখন রমা কলেজের পূর্ণ সময়ের অধ্যাপক। ছোট ছোট ছাত্রছাত্রীদের চোখে
নিজের পুরনো মুখটা দেখে বুক ভরে উঠত। বছরের পর বছর কেটে গেল। ওদিকে আরো ওপরে ওঠার জন্য
প্রন্সিপালের পরীক্ষা দেয়। একদিন হঠাৎ কলেজে খবর এল —
প্রিন্সিপাল ডেকে বললেন- “রমা মেম, আপনিই এবার প্রিন্সিপাল হচ্ছেন।
এই আপনার চিঠি ।”
রমার কিছুই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে যেন সবই স্বপ্ন।
দিন কয়েক আগে রীনা ফোন করে বলেছিল- ‘তুই একদিন বড় হবি রে রমা !”
রমা হেসে বলেছিল, “বড় হওয়া মানে শুধু চেয়ারে বসা নয়, রীনা — নিজের
জায়গা থেকে কিছু বদলাতে পারা।”
রমার প্রথম পোস্টিংটা ছিল আদিবাসী এলাকায়। পাহাড়, গাছ, ছোট ছোট
কুঁড়েঘর, আর একখানা ভাঙা কলেজ বিল্ডিং। প্রথম দিনই পিয়ন বলেছিল,
“ম্যাডাম, এখানে কেউ বেশিদিন টেকে না।”
রমা হেসে বলেছিল, “তাহলে আমিই প্রথম হব, যে টিকে দেখাবে।”
সেই থেকেই শুরু—গাছতলায় ক্লাস, ছাত্রদের জন্য বই সংগ্রহ, স্থানীয়দের
সঙ্গে কথা বলে কলেজে রঙ করানো, লাইব্রেরি খোলা,খেলার মাঠ তৈরি ইত্যাদি ।
আদিবাসী ছাত্রছাত্রীরা বলত, “ম্যাডাম,
আপনি না থাকলে আমরা কলেজেই আসতাম না।”
রমা শুধু বলত, “আমি কেউ না, সবই উপরওয়ার ইচ্ছা। এই বিশ্বাসটাই রাখো।”
বছরের পর বছর কেটে গেল, রমা যেন ওদের পরিবারেরই একজন হয়ে উঠল।আদিবাসী
ছাত্রছাত্রীরা রমাকে ভালোবেসে ফেলে।জঙ্গলী দেশি মুরগির মাংস এনে খাওয়ায়,গাছের মিস্টি
আম আন…আরো কত কী..। কিন্তু শরীর সইল না রমার। ট্রান্সফার চেয়ে চলে এল নিজের পুরনো শহরে,
নিজের পড়াশোনার কলেজে। কলেজর অধ্যাপকরা রমার সামনে প্রশংসা করলেও তার এখনে আশাকে মেনে নিতে পারেনি।
কাজে যোগ দিয়ে প্রথম দিনই বুঝল— কাজ সহজ নয়। অধ্যাপকরা রাজনীতি
করছে, ক্লাস হয় না, ছাত্ররা টিউশানে মনোযোগী হয়েছে ক্লাসে নয়।
দুদিনের মাথা মিটং ডেকে অনেক নতুন নিয়ম চালু করতে চাইল রমা।
একজন সিনিয়র শিক্ষক তাচ্ছিল্য করে বলল- “ম্যাডাম, এত নিয়ম নিয়ে
চললে কলেজ চালানো কষ্ট হবে।”
রমা শান্ত গলায় বলল,
“নিয়ম না থাকলে মানুষই টিকবে না, স্যার। গোটা বিশ্ব নিয়মের অধীন।”
ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল। কঠোর হাতে কাজ ধরা, ছাত্রছাত্রীরা
মধ্যে নতুন উৎসাহ আনা, নতুন প্রজেক্ট শুরু— এক বছরর মধ্যে কলেজ যেন নবজীবন পেল।
একদিন বিকেলে ছাদের ধারে দাঁড়িয়ে রমা দেখল ছাত্রছাত্রীরা হাসছে,
খেলছে, পড়ছে। রীনার ফোন এল আবার।
“এই রমা, কেমন চলছে?”
রমা একটু চুপ থেকে মনের উচ্ছ্বাসে বলল- “চলছে রে… আমার কলেজটা আবার
বাঁচতে শিখেছে।একদিন চলে আয় কলেজে।”
রীনা হেসে বলল, “তুই তো আগেও বলেছিলি — বড় হওয়া মানে নিজেকে সঠিক
রেখে চারপাশ বদলে দেওয়া।”
রমা ধীরে বলল, “হ্যাঁ রে রীনা, আজ বুঝেছি— জীবনের সর্বোচ্চ স্থানে
পৌঁছনো মানে শুধু সাফল্য নয়, অন্যের জীবনে আলো জ্বালানো।”

কোন মন্তব্য নেই
ok