পাশ্চাত্য অনুসঙ্গে জীবনানন্দের “বনলতা সেন” কবিতায় প্রেম-চেতনা ।। ড. নীলোৎপল জানা
বনলতা সেন
জীবনানন্দ দাশ
=============================
হাজার বছর ধ'রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি: বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।
চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের 'পর
হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে 'এতদিন কোথায় ছিলেন?
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।
সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে;
ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে- সব নদী- ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।
===========================
পাশ্চাত্য অনুসঙ্গে জীবনানন্দের “বনলতা সেন” কবিতায় প্রেম-চেতনা।
জীবনানন্দ দাশের “বনলতা সেন”
কেবল একটি প্রেমের কবিতা নয়। এটি এক দীর্ঘ মানবযাত্রার ক্লান্তি, স্মৃতি ও আশ্রয়ের
কবিতা। এই কবিতার প্রেমচেতনা গড়ে উঠেছে সময়, ইতিহাস আর নৈঃসঙ্গ্যের ভিতর দিয়ে।
এখানে প্রেম কোনো তাৎক্ষণিক আবেগ নয়। বরং হাজার বছরের পথচলার শেষে পাওয়া এক শান্ত
বিরতি। এই জায়গায় জীবনানন্দের প্রেমভাবনা বিদেশি কবিদের প্রেমভাবনার সঙ্গে
গভীরভাবে সংলগ্ন।
বিদেশি কবিতার ধারায় প্রেমকে প্রায়ই দেখা যায়
দুই রকম ভাবে। একদিকে রোমান্টিক কবিদের আবেগময়, তীব্র, প্রায় বিস্ফোরণধর্মী প্রেম।
অন্যদিকে আধুনিক কবিদের কাছে প্রেম অনেক বেশি অন্তর্মুখী, স্মৃতিনির্ভর এবং
নিঃশব্দ। জীবনানন্দ এই দ্বিতীয় ধারার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে।
উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায় প্রকৃতি যেমন
মানুষের মানসিক আশ্রয়, তেমনি “বনলতা সেন”-এ একজন মানুষ হয়ে ওঠে আশ্রয়।
ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রকৃতির মধ্যে শান্তি খুঁজেছেন দীর্ঘ ক্লান্তির পরে। জীবনানন্দ সেই
শান্তিকে খুঁজেছেন এক নারীর মুখে, চোখে, উপস্থিতিতে। বনলতা সেন প্রকৃতির বিকল্প
নন, বরং প্রকৃতির মতোই নীরব ও স্থির।
টি. এস.
এলিয়টের কবিতায় আধুনিক মানুষের ক্লান্তি, বিচ্ছিন্নতা আর অর্থহীনতার অনুভব প্রবল।
“দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড”-এর মানুষ ইতিহাসের ভারে নুয়ে পড়া, দিশাহীন। জীবনানন্দের
কবিতার মানুষও তেমনি ইতিহাসের ভিতর দিয়ে হেঁটে এসেছে।
“বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগৎ”
শুধু অতীতের উল্লেখ নয়, এটি সময়ের ভার। এই ভার বইতে বইতে
কবি ক্লান্ত। বনলতা সেন সেই ক্লান্তির মধ্যে এক মুহূর্তের অর্থবোধ এনে দেন। এলিয়ট
যেখানে প্রশ্নে থামেন, জীবনানন্দ সেখানে এক শান্ত উপস্থিতির কথা বলেন।
এজরা পাউন্ডের
ইমেজিস্ট ধারার প্রভাব জীবনানন্দের ভাষায় স্পষ্ট। সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর
চিত্রকল্প।
“চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা”
বা “মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য”
এই পঙ্ক্তিগুলি সরাসরি কোনো বর্ণনা নয়। এগুলি
সাংস্কৃতিক স্মৃতির ইমেজ। পাউন্ড যেমন ইতিহাস আর বর্তমানকে এক ফ্রেমে আনতেন,
জীবনানন্দও তেমনই করেন। প্রেম এখানে ইতিহাসবিচ্ছিন্ন নয়।
পাবলো নেরুদার
প্রেমকবিতায় প্রেম দেহময়, স্পর্শকাতর, উচ্চকণ্ঠ। জীবনানন্দের প্রেম তার বিপরীত।
এখানে স্পর্শ নেই, উচ্ছ্বাস নেই। আছে দেখা, বলা, বসে থাকা। বনলতা সেন প্রশ্ন করেন-
“এতদিন কোথায় ছিলেন?”
এই একটি সাধারণ প্রশ্নেই হাজার বছরের দূরত্ব ধরা পড়ে।
নেরুদার প্রেম যেখানে উপস্থিতির উদযাপন, জীবনানন্দের প্রেম সেখানে প্রাপ্তির
নীরবতা।
রাইনার মারিয়া রিলকের কবিতায় প্রেম প্রায়ই
একাকিত্বের সম্মান রক্ষা করে। তিনি মনে করতেন, প্রেম মানে দুটি একাকিত্বের
পরস্পরকে রক্ষা করা। বনলতা সেন ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে। তিনি কবিকে গ্রাস করেন না।
তিনি কবির ক্লান্ত জীবনের পাশে বসেন।
“মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন”
এই পঙ্ক্তিতে প্রেমের সংজ্ঞা খুব স্পষ্ট। প্রেম মানে
মুখোমুখি বসা, দাবি না করা, শব্দ কমানো। এই কবিতায় প্রেম সময়কে থামায়। “সমস্ত
দিনের শেষে” সন্ধ্যার মতো প্রেম আসে। এটি দিনের কাজের মাঝখানে আসে না। আসে যখন
সব লেনদেন শেষ। এই ধারণা বিদেশি আধুনিক কবিতার সঙ্গেই মিলে যায়, যেখানে প্রেম কোনো
সামাজিক নাটক নয়, বরং ব্যক্তিগত আশ্রয়।
আরও লক্ষণীয়, বনলতা সেন কোনো আদর্শ নারী নন।
তিনি দেবী নন, নায়িকা নন। তিনি নাটোরের মনোলতা। একটি নির্দিষ্ট জায়গার মানুষ।
কিন্তু তাঁর ভিতর দিয়ে কবি বিশ্ব ইতিহাসকে স্পর্শ করেন। এখানেই জীবনানন্দ আধুনিক।
যেমন কবি কাফকার লেখায় ছোট ঘর বা সাধারণ মানুষ হঠাৎ অস্তিত্বের প্রশ্নের
মুখোমুখি দাঁড়ায়, তেমনি বনলতা সেনের সাধারণ উপস্থিতি কবির দীর্ঘ অস্তিত্বযাত্রাকে
থামিয়ে দেয়।
বিদেশি কবিতায়, বিশেষ করে আধুনিক ইউরোপীয়
কবিতায়, প্রেম অনেক সময়ই অসম্পূর্ণ, ভঙ্গুর। জীবনানন্দের প্রেমও পূর্ণতার দাবি করে
না। এটি স্থায়ী সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি নয়। এটি এক মুহূর্তের শান্তি। কিন্তু সেই
মুহূর্তই যথেষ্ট। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে
যুক্ত।
সবশেষে বলা যায়, “বনলতা সেন”-এর প্রেমচেতনা
কোনো একক দেশীয় অনুভব নয়। এটি বিশ্বমানবের ক্লান্তির কবিতা। বিদেশি কবিদের মতো
জীবনানন্দও প্রেমকে দেখেছেন আশ্রয় হিসেবে, প্রশ্নের উত্তর হিসেবে নয়। ইতিহাস, সময়,
একাকিত্বের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে মানুষ যে সামান্য শান্তি খোঁজে, বনলতা সেন সেই
শান্তির নাম।
এই কারণেই এই কবিতা আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ আজও
মানুষ হাঁটে, ক্লান্ত হয়, ইতিহাস বইতে থাকে। আর সন্ধ্যার মতো নেমে আসে একটি মুখ,
একটি উপস্থিতি, যে কিছু বলে না, শুধু মুখোমুখি বসে থাকে।

কোন মন্তব্য নেই
ok