কবি ও গল্পকার নীলোৎপল জানার “নীল নীরবতা” একটি আধুনিক মানবিক গল্প।।। আলোচক: অধ্যাপক শংকরপ্রসাদ গুড়িয়া
কবি ও গল্পকার নীলোৎপল জানার “নীল নীরবতা” একটি আধুনিক মানবিক গল্প, যেখানে ভালোবাসা, হারানো, অপরাধবোধ এবং পুনর্জন্মের মতো অনুভূতিগুলো সূক্ষ্মভাবে মিশে আছে। গল্পটি শুধু এক দাম্পত্য জীবনের ভাঙনের কাহিনি নয়—এটি মূলত মানুষের হৃদয়ের পরিবর্তন এবং নতুনভাবে জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়ার গল্প।
অরিজিৎ ও মিতা—দুজনের কলেজজীবনের বন্ধুত্ব ভালোবাসায় রূপ নেয়, পরে তারা বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করে। কিন্তু সন্তানহীনতার বেদনা তাদের সম্পর্কের ভেতর ধীরে ধীরে বিষ ঢেলে দেয়। মিতা নিজেকে অক্ষম ভেবে সংসার ছেড়ে চলে যায়, অরিজিৎ ডুবে যায় এক নিঃসঙ্গ জীবনে।
বছর তিন পরে, অরিজিৎ যখন এক অনাথ আশ্রম থেকে মীনা নামের এক মেয়েকে দত্তক নেয়, তখন তার জীবনে ফিরে আসে এক নতুন শান্তি। সেই সময়ই আবার মিতার আগমন—তবে এবার সম্পর্কের দাবি নিয়ে নয়, বরং বোঝাপড়ার উষ্ণতায়। শেষ অধ্যায়ে দেখা যায়, মীনা, অরিজিৎ ও মিতা—তিনজনের মধ্যে গড়ে ওঠে এক নতুন বন্ধন, যা প্রমাণ করে, শেষ মানেই শেষ নয়; প্রতিটি সমাপ্তিই এক নতুন সূচনা।
গল্পের প্রধান চরিত্র অরিজিৎ এক সংবেদনশীল, দায়িত্ববান, কিন্তু ভেতরে ভাঙা মানুষ। তার চরিত্রটি বাস্তব, কারণ দাম্পত্য জীবনের চাপ, প্রত্যাশা ও হতাশা—সবই জীবন্তভাবে ফুটে উঠেছে।
মিতা গল্পের সবচেয়ে গভীর চরিত্র। মাতৃত্বহীনতার অপরাধবোধে সে নিজেকে সরিয়ে নেয়, কিন্তু শেষে নতুন অর্থে ‘মা’ হয়ে ওঠে—ভালোবাসার মাধ্যমে।
রেখা ও মীনা - এই দুই চরিত্র গল্পে ‘আলোর প্রবেশদ্বার’। রেখা অরিজিতের জীবনে মানবিকতার পুনর্জাগরণ ঘটায়, আর মীনা গল্পটিকে আশাবাদী সমাপ্তির দিকে নিয়ে যায়।
গল্পটির মূল ভাব হলো—ভালোবাসার প্রকৃত মানে গ্রহণ ও ক্ষমা; সম্পর্ক ভাঙলেও মানবিক সংযোগ কখনও হারায় না।
গল্পকার দেখিয়েছেন, জীবনের অর্থ কেবল দাম্পত্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভালোবাসার পরিসর অনেক বৃহৎ। মাতৃত্ব বা পিতৃত্ব রক্তের নয়—মনের অনুভূতির মাধ্যমে তা সম্পূর্ণ হয়।
গল্পের ভাষা কাব্যিক ও সংযত—প্রতিটি সংলাপ যেন আবেগে ডুবানো। “আমরা দু’জনেই হারিনি, শুধু হারিয়ে গেছি নিজেদের ভেতর”—এরকম বাক্যগুলো গল্পকে গভীর সাহিত্যিক মাত্রা দিয়েছে।
বর্ণনা ও প্রতীকের ব্যবহারও প্রশংসনীয়—“নীল নীরবতা”, “চুলের ক্লিপ”, “নীলিমা গাছ”—এসবই ভালোবাসার স্থায়ী প্রতীক হয়ে উঠেছে।
গল্পটির কাহিনির আবেগগত গঠন অত্যন্ত দৃঢ়। প্রতিটি অধ্যায়ের মধ্যে সময় ও অনুভূতির পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটে, যা বাস্তবসম্মত। সংলাপ স্বাভাবিক, অথচ হৃদয়গ্রাহী।
তবে দ্বিতীয় অধ্যায়ে রেখা চরিত্রটির বিকাশ কিছুটা সীমিত; তার আবির্ভাব আরও গভীরভাবে দেখালে গল্পের মানবিক দিক আরও উজ্জ্বল হতো। মাঝে মাঝে বর্ণনার কাব্যিকতা এতটাই তীব্র যে বাস্তব আবহ খানিকটা ঢেকে যায়।
এ সত্ত্বেও “নীল নীরবতা” আধুনিক সমাজে ভাঙা সম্পর্ক ও নতুনভাবে বাঁচার এক অনন্য উদাহরণ। এটি কেবল প্রেমের নয়, ক্ষমা ও পুনর্জন্মের গল্প।
শেষে পূর্ণ চাঁদের নিচে তিনটি চরিত্রের মিলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
“ভালোবাসা শেষ হয় না; রূপ বদলায়, গভীর হয়।”

কোন মন্তব্য নেই
ok