Translate

ছোটগল্প: “স্বপ্নের দূরত্ব” (৩য় গল্প)

 


ছোটগল্প:

স্বপ্নের দূরত্ব

 নীলোৎপল জানা

   বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান রাতুল। ছোটোবেলা থেকেই পড়াশোনায় দারুণ মেধাবী। স্কুলে প্রতি বছর প্রথম, কলেজেও নাম করেছিল ভালো রেজাল্টের জন্য। বাবা, গ্রামের উচ্চবিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক,বেতন খুবই কম। ছেলেকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতেন—"রাতুল একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে।”

   রাতুলের মা প্রতিদিন ভোরে উঠে ওর জন্য পছন্দের খাবার বানাতেন ও সঙ্গে দুধ, ডিম, ফল—যেন ছেলেটা সুস্থ থাকে, মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। ঘরের যত অভাব, তাঁরা হাসিমুখে সহ্য করতেন, শুধু ছেলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে—এই বিশ্বাসে।

   কলেজ শেষে রাতুলের সুযোগ এল দিল্লির জে.এন.ইউ তে অঙ্কে হায়ার স্টাডির জন্য। ইতমধ্যে বাবা অবসর নিলেন চাকরি থেকে। পেনশনের টাকাটা আগেভাগেই তুললেন, কিছু ধারও করলেন, যাতে ছেলে নিশ্চিন্তে পড়তে পারে। বিদায়ের দিন মা চোখের জল লুকিয়ে বললেন—“ যাই কর শুধু নিজের খেয়াল রাখিস।” বাবা শুধু বললেন—“মন দিয়ে পড়বে, মনে রেখো, আমরা তোমাকে বিশ্বাস করি।”

   দিল্লি গিয়ে রাতুলের জীবনে নতুন এক জগৎ খুলে গেল। স্বাধীনতা, নতুন বন্ধুবান্ধব, নতুন অভিজ্ঞতা—সব কিছুই ঝলমলে। প্রথম কয়েক মাস চিঠি আর ফোনে খোঁজখবর নিত নিয়মিত, তারপর ধীরে ধীরে ব্যস্ততার অজুহাতে যোগাযোগ কমতে লাগল।

   বছর তিন পর একদিন পোস্টে এলো একটা সংক্ষিপ্ত চিঠি—“আমি চাকরি পেয়েছি, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, বড় কোম্পানিতে। খুব ভালো আছি, টেনশন নিও না।” বাবা-মা আনন্দে আত্মহারা। কিন্তু তারপর মাস, বছর পেরোলেও রাতুল আর ফিরল না। ফোনে মাঝে মাঝে কথা হতো, তাও সংক্ষিপ্ত—“সময় নেই বাবা, পরে কথা বলব।”

   পাঁচ বছর পর একদিন হঠাৎ গ্রামের মোড়ে লোকজনের ভিড়। গ্রামের রাস্তায় এখন কাদা নেই, ঢালাই। একটা কালো গাড়ি থামল, স্যুট-পরা এক তরুণ—চোখে কালো চশমা, হাতে দামি মোবাইল নিহে নামলো। প্রথমে কেউ চিনতেই পারেনি। তারপর এক বৃদ্ধ প্রতিবেশী গোপাল কাকা কাঁপা গলায় বললেন—“রাতুল…? ” হ্যাঁ, সে-ই…..।

কিন্তু এই ফিরে আসায় কাকার বা গ্রামের মানুষের মনে তেমন কোনো উচ্ছ্বাস নেই।

রাতুল ভয়ে ও আনন্দে ঘরে ঢুকল।

বাবা তখন স্ট্রোকে কথা বলতে পারেন না, মা শয্যাশায়ী।

রাতুল মায়ের হাত ধরল, মুখের পাশে মুখ রাখল। মা শুধু একবার বললেন- “তুই খুব দূরে চলে গেছিলিরে বাবা… শুধু জায়গায় না, মনেও….।”

রাতুলের চোখের কোণ ভিজে উঠল।

বাইরে গাছে পাখি ডাকছে, ভেতরে নীরবতা।

বাবা ও মা মনে মনে ভাবে- ‘সব স্বপ্ন পূরণ হয় না, কিছু স্বপ্ন দূরত্বে মিলিয়ে যায়…’

কাজের ব্যস্ততার কারণে রাতুলকে বিকেলের ফ্লাইটে দিল্লী ফিরে যেতে হয়। সেখানে ফিরে গিয়ে তার বাবা-মাকে একটি চিঠি লেখে রাতুল-

পূজনীয়  

বাবা-মা,

প্রণাম;

   চিঠিটা লিখছি অনেকদিন পর। জানি, এই কাগজে লেখা কিছু শব্দ তোমাদের জীবনের ফাঁক পূরণ করতে পারবে না, তবুও লিখছি—নিজেকে একটু হালকা করার জন্য।

   যেদিন দিল্লি যাচ্ছিলাম, মা তোমার চোখের জল লুকোতে দেখেছিলাম। বাবার মুখে তখন শুধু হাসি ছিল, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে কতটা আশা, কতটা ভয়—আমি বুঝিনি। বুঝতে পারিনি, শহরের আলো কখন যেন আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে।

   কেরিয়ারিস্ট হতে গিয়ে  চারপাশের দৌড়, প্রতিযোগিতা, বিলাসিতা—সবকিছু আমাকে গ্রাস করে নিয়েছিল। বন্ধুরা বলত—“এই গ্রামীণ ভাব ঝেড়েফেল, বড় হতে গেলে বদলাতে হয়।” আমি বদলাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বুঝিনি, বদলে যাচ্ছিলাম ভিতর থেকে।

   ফোন করতে আলস্য লাগত, চিঠি লিখতে সময় পেতাম না—অথবা মনে করতাম, পরে লিখব। অথচ প্রতিদিনই তোমরা হয়তো আমার খবরের অপেক্ষায় ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে থেকেছ। চাকরি পেলাম, টাকা রোজগার শুরু করলাম। কিন্তু আজ বুঝি—টাকায় শান্তি কেনা যায় না, কেনা যায় না তোমাদের সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।   

   যেদিন বাড়ি ফিরলাম, বাবা তখন কথা বলতে পারছ না, মায়ের চোখে শুধু গভীর ক্লান্তি। আমি তখন সফল মানুষ, কিন্তু ব্যর্থ সন্তান।

   আজ আমাকে দিল্লিতে ফিরতে হল—কাজের দায়ে নয়, একধরনের শাস্তির মতো। নিজের একাকিত্বের ঘরে বসে আমি প্রতিদিন ভাবি—যদি সময়টা ফিরিয়ে আনা যেত!

   তবু একটা প্রতিশ্রুতি রাখব—এবার থেকে প্রতিদিন তোমাদের সঙ্গে কথা বলব, মা। তোমার জন্য প্রতি মাসে শুধু টাকা নয়, সময়ও রাখব। কারণ ভালোবাসা টাকা নয়, সময় চায়।

                                                                                                                       প্রণাম                              

                                                                                                          তোমাদের অপরাধী ছেলে,                  

                                                                                         রাতুল!

                                                                                             

                                                                                                         



কোন মন্তব্য নেই

ok

4x6 থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.