Translate

সমাস : আলোচক- ড. নীলোৎপল জানা

 





সমাস কাকে বলে?

অর্থসম্বন্ধ আছে এমন একাধিক শব্দের এক সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি নতুন শব্দ গঠনের প্রক্রিয়া কে সমাস বলে। যেমন – দেশের সেবা= দেশসেবা

  • পাশাপাশি দুই বা তার অধিক শব্দ থাকতে হবে।
  • এসব শব্দের মধ্যে অর্থসঙ্গতি থাকতে হবে।
  • নতুন শব্দ গঠন করার ক্ষমতা থাকতে হবে।

 প্রয়োজনীয়তা

  • অনেক নতুন শব্দ গঠন করা যায়।
  • ভাষাকে সহজ-সরল, সংক্ষিপ্ত, প্রাঞ্জল ও শ্রুতিমধুর করা যায়।
  • অল্প কথায় ব্যাপক ভাব প্রকাশ করা যায়।
  • সহজভাবে শব্দ উচ্চারণ করা যায়।
  • বক্তব্যকে সুন্দর, শ্রুতিমধুর, সংক্ষিপ্ত, সহজ-সরল, অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ করা যায়।
  • বাক্যকে গতিশীল করা যায়।

 সন্ধি ও সমাসের পার্থক্য

বাংলা ভাষায় নতুন শব্দ গঠনের ক্ষেত্রে সন্ধি ও সমাসের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। নতুন শব্দ গঠন করে এ দুটি বিষয়ই বাংলা ভাষায় সংক্ষিপ্ততা, প্রাঞ্জলতা ও শ্রুতিমধুরতা আনে। এতদ সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও উভয়ের মধ্যে কিছু কিছু বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান। নিচে এদের বৈসাদৃশ্যগুলো তুলে ধরা হল----

  1. সন্ধি হল পাশাপাশি দুটি ধ্বনি বা বর্ণের মিলন। যেমন- অতি + অন্ত = অত্যন্ত। সমাস হল একাধিক পদের একপদে মিলন। যেমন- বিলাত হতে ফেরত= বিলাতফেরত।
  2. 'সন্ধি' শব্দের অর্থ হল মিলন।'সমাস' শব্দের অর্থ হল সংক্ষেপণ।
  3. সন্ধির লক্ষ্য বর্ণের মিলন। অর্থের সাথে তেমন কোন সম্পর্ক নেই। সমাসের লক্ষ্য পদের মিলন। অর্থের সাথে এটি সম্পর্কিত।
  4. সন্ধিতে পদের বিভক্তি লোপ পায় না। সমাসের ক্ষেত্রে অলুক সমাস ব্যতীত প্রতিটি সমাসে পদের বিভক্তি লোপ পায়।
  5. সন্ধি উচ্চারণের কাঠিন্য দূর করে এবং লঘুতা সৃষ্টি করে। সমাস বাক্যকে সংক্ষেপ করে এবং শ্রুতিমধুরতা বৃদ্ধি করে।
  6. সন্ধিতে পদের স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে। সমাসে পদগুলো একপদের মধ্যে হারিয়ে যায়।
  7. সন্ধিতে দুই বর্ণের মাঝে (+) যোগ চিহ্ন ব্যবহার করতে হয়। সমাসে দুই পদের মাঝে সাধারণত অব্যয় পদ ব্যবহার করা হয়।
  8. সন্ধি প্রধানত তিন প্রকার। যথা- স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জন সন্ধি, বিসর্গ সন্ধি। সমাস প্রধানত ছয় প্রকার। যথা- দ্বন্দ্ব,দ্বিগু, বহুব্রীহি, কর্মধারয়, তৎপুরুষ, অব্যয়ীভাব।

সমাসের উপাদান (ব্যাখ্যা)

১) সমস্যমান পদ : যে যে পদে সমাস হয় তাদের প্রত্যেকটিকে সমস্যমান পদ বলে। যথা— ধানের ক্ষেত = ধানক্ষেত। এখানে ‘ধানের’ এবং ‘ক্ষেত’ এ দুটি সমস্যমান পদ ।

২) সমস্ত পদ : সমাসবদ্ধ বা সমাস নিষ্পন্ন পদকে সমস্তপদ বলে। যথা— সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন। এখানে ‘সিংহাসন’ পদটি সমস্তপদ।

৩) ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহ বাক্য : সমাসের অর্থ বোঝাবার জন্য সম্বন্ধযুক্ত যে পদগুলোকে ব্যাখ্যা করা হয়, তাদেরকে ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য বলে। যথা— ঘরে আশ্রিত জামাই = ঘরজামাই।' এখানে ঘরে, আশ্রিত, জামাই কথাগুলো ব্যাসবাক্য।

৪) পূর্বপদ ও উত্তরপদ/পরপদ : সমাসবদ্ধপদ বা সমস্তপদের প্রথম অংশকে বলা হয় পূর্বপদ এবং পরবর্তী অংশকে বলা হয় উত্তরপদ বা পরপদ। যেমন— কুসুমের মতো কোমল = কুসুমকোমল। এখানে ‘কুসুম’ পূর্বপদ এবং ‘কোমল’ উত্তরপদ বা পরপদ।

 প্রকারভেদ

  • দ্বন্দ্ব 
  • দ্বিগু 
  • কর্মধারয় 
  • তৎপুরুষ 
  • বহুব্রীহি 
  • অব্যয়ীভাব 

সমাস

 

দ্বন্দ্ব সমাস

যে সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদের অর্থের প্রাধান্য থাকে তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন: মা ও বাবা=মা-বাবা। দ্বন্দ্ব সমাস কয়েক প্রকারে সাধিত হয়:

  • মিলনার্থক শব্দযোগে: মা-বাপ, মাসি-পিসি, ইত্যাদি।
  • বিরোধার্থক শব্দযোগে: দা-কুমড়া, অহি-নকুল, স্বর্গ-নরক ইত্যাদি।
  • বিপরীতার্থক শব্দযোগে:  আয়-ব্যয়, জমা-খরচ ইত্যাদি।

 

দ্বিগু সমাস

সমাহার (সমষ্টি) বা মিলন অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে বিশেষ্য পদের যে সমাস হয় তাকে দ্বিগু সমাস বলে।

  • দ্বিগু সমাসে সমাসনিষ্পন্ন পদটি বিশেষ্য পদ হয়। যেমন: তিন কালের সমাহার = ত্রিকাল।

দ্বন্দ্ব সমাস চেনার সহজ উপায়-

‘দ্বন্দ্ব’ শব্দের অর্থ জোড়া। যে সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদে অর্থের প্রাধান্য থাকে এবং কেউ কারও দ্বারা সঙ্কুচিত হয় না, তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন—জীবন ও মরণ = জীবন-মরণ,পোকা ও মাকড় = পোকা-মাকড় ,সাত ও সতের = সাত-সতের। দ্বন্দ্ব সমাস চেনার সহজ উপায় হল-

ব্যাসবাক্যে ‘ও / এবং / আর’ থাকবে। উভয় পদের অর্থ প্রাধান্য পাবে।

সমীকরণ : সমজাতীয় পদ + ও + সমজাতীয় পদ।

[এখানে সমজাতীয় পদ মানে প্রথমটি বিশেষ্য হলে শেষেরটিও বিশেষ্যে; অনুরূপভাবে প্রথমটি বিশেষণ, সর্বনাম বা ক্রিয়া হলে যথাক্রমে শেষের পদটিও বিশেষণ, সর্বনাম বা ক্রিয়া হবে। ]

উদাহরণগুলো লক্ষ্য কর :

ভাই (বিশেষ্য) + ও + বোন (বিশেষ্য) = ভাই-বোন

ভালো (সর্বনাম) + ও + মন্দ (সর্বনাম) = ভালো-মন্দ

যা (সর্বনাম) + ও + তা (সর্বনাম) = যা-তা

হেসে (ক্রিয়া) + ও + খেলে (ক্রিয়া) = হেসে-খেলে

দ্বন্দ্ব সমাসের বিশেষ নিয়ম--

এবং, ও, আর, তথা ইত্যাদি সংযোগার্থক অব্যয়ের সাহায্যে দ্বন্দ্ব সমাসের ব্যাস অর্থাৎ বিভাগ করতে হয়।

অপেক্ষাকৃত পূজনীয় শব্দ এবং স্ত্রীবাচক শব্দ আগে বসে। যেমন— মা ও বাপ = মা-বাপ, গুরু ও শিষ্য = গুরু-শিষ্য।

যে পদটির অর্থ অপেক্ষাকৃত গৌরববোধক বলে বিবেচিত হয়, সে পদটি অন্যটির অপেক্ষা দীর্ঘ হলেও প্রথমে বসতে পারে।

যে পদটি বানানে বা উচ্চারণে অপেক্ষাকৃত ছোট, সে পদটি আগে বসে। যেমন— দেনা ও পাওনা দেনা-পাওনা পান ও তামাক = পান-তামাক

হসন্ত, আ-কারান্ত ও সন্ধি স্বরযুক্ত পদ আগে বসে। যেমন— সুখ-দুঃখ, নদ-নদী, দাস-দাসী।

সমান স্বরবিশিষ্ট পদের মধ্যে উ-কার কিংবা ও-কার যুক্ত পদটি পরে বসে। যেমন— হাতি-ঘোড়া, নাক-মুখ, কানা-ঘুষা।

দ্বন্দ্ব সমাসের শ্রেণিবিভাগ

১. মিলনার্থক দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে সমস্যমান পদগুলোর মধ্যে অভিন্ন সম্পর্ক থাকে, তাকে মিলনার্থক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন—

 ছেলে ও মেয়ে = ছেলে-মেয়ে

পিতা ও পুত্র = পিতা-পুত্র

মাছ ও ভাত = মাছ-ভাত

ভাই ও বোন = ভাই-বোন

জিন ও পরী = জিন-পরী

২. বিরোধার্থক দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে পরপদটি পূর্বপদের বৈরী অর্থ বা ভাব প্রকাশ করে, তাকে বিরোধার্থক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন-

 অহি ও নকুল = অহি-নকুল

দা ও কুমড়া = দা-কুমড়া

স্বর্গ ও নরক = স্বর্গ-নরক

দেও ও দানব = দেও-দানব

৩. সমার্থক দ্বন্দ্ব : একই জাতীয় বস্তুর সংযোগে যে দ্বন্দ্ব সমাস হয়, তাকে সমার্থক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন—

 হাট ও বাজার= হাট-বাজার

বই ও পুস্তক = বই-পুস্তক

চিঠি ও পত্র = চিঠি-পত্র

ঘর ও বাড়ি = ঘর-বাড়ি

৪. বিপরীতার্থক দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে পরপদটি পূর্বপদের বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে, তাকে বিপরীতার্থক দ্বন্দ্ব সমাস বলে।যেমন—

ছোট ও বড় = ছোট-বড়

জমা ও খরচ = জমা-খরচ

দেশ ও বিদেশ = দেশ-বিদেশ

সত্য ও মিথ্যা = সত্য-মিথ্যা

আয় ও ব্যয় = আয়-ব্যয়

জোয়ার ও ভাটা = জোয়ার-ভাটা

আকাশ ও পাতাল = আকাশ-পাতাল

৫. সংখ্যাবাচক দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে উভয় পদের দ্বারা সংখ্যা বোঝায়, তাকে সংখ্যাবাচক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন-

 বিশ ও পঁচিশ = বিশ-পঁচিশ

লক্ষ অথবা কোটি = লক্ষ-কোটি

সাত ও সতের = সাত-সতের

সাত ও পাঁচ = সাত-পাঁচ

উল্লেখ্য সংখ্যাবাচক দ্বন্দ্বে উভয় পদের অর্থই প্রাধান্য পায় কিন্তু সংখ্যাবাচক বহুব্রীহিতে পূর্বপদ এবং পরপদ কোনটির অর্থ না বুঝিয়ে অন্য কোন তৃতীয় অর্থ প্রকাশ করে।যেমন-দশ গজ পরিমাণ = দশগজি। এই দশগজি দ্বারা দশগজ পরিমাণ কোন একটি বস্তুকে বোঝাচ্ছে।তাই এটি সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি। এরকম আরো-চেীচালা,চারহাতি,পঞ্চানন ইত্যাদি

৬. সহচর দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে পরপদটি পূর্বপদের সহচর হিসেবে যুক্ত হয়, তাকে সহচর দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন-

 সর্দি ও কাশি = সর্দি-কাশি

খানা ও পিনা = খানা-পিনা

বন ও বাদাড় = বন-বাদাড়

ছল ও চাতুরী = ছল-চাতুরী

ধর ও পাকড় = ধর-পাকড়

কাপড় ও চোপড় = কাপড়-চোপড়

পোকা ও মাকড় = পোকা-মাকড়

চুরি ও চামারি = চুরি-চামারি

হৈ ও হল্লা = হৈ-হল্লা

ধুতি ও চাদর = ধুতি-চাদর

৭. বহুপদী দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে দুয়ের অধিক পদের মধ্যে সমাস হয়, তাকে বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন-

 সাহেব বিবি ও গোলাম = সাহেব বিবি গোলাম

জন্ম, মৃত্যু আর বিবাহ = জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ

রূপ, রস, গন্ধ ও স্পর্শ = রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ

চন্দ্ৰ, সূর্য, গ্রহ ও নক্ষত্র = চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র

ইট, কাঠ ও পাথর = ইট-কাঠ-পাথর

৮. একশেষ দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে প্রধান পদটি অবশিষ্ট থাকে ও অন্য পদগুলো লোপ পায় এবং শেষ পদ অনুসারে শব্দ নির্ধারিত হয়, তাকে একশেষ দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন—

 তুমি, সে ও আমি = আমরা

জায়া ও পতি = দম্পতি

৯. অলুক দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে কোন সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ পায় না, তাকে অলুক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। 

যেমন—

হাতে ও কলমে = হাতে-কলমে

পথে ও ঘাটে = পথে-ঘাটে

দেশে ও বিদেশে = দেশে-বিদেশে

জলে ও স্থলে = জলে-স্থলে

দ্বন্দ্ব সমাসকে অন্যভাবেও ভাগ করা যায়। যেমন—

 

১. বিশেষ্য পদের দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসের উভয় পদ বিশেষ্য, তাকে বিশেষ্য পদের দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন—

 চোখ ও কান = চোখ-কান

জন্ম ও মৃত্যু = জন্ম-মৃত্যু

নদ ও নদী = নদ-নদী

জীবন ও মরণ = জীবন-মরণ

ধান ও পাট = ধান-পাট

২. বিশেষণ পদের দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসের উভয় পদ বিশেষণ, তাকে বিশেষণ পদের দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন—

 সহজ ও সরল = সহজ-সরল

ভালো ও মন্দ = ভালো-মন্দ

আসল ও নকল = আসল-নকল

ছোট ও বড় = ছোট-বড়

সৎ ও অসৎ = সৎ-অসৎ

৩. সর্বনাম পদের দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসের উভয় পদ সর্বনাম, তাকে সর্বনাম পদের দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন-

 তুমি আর আমি = তুমি-আমি

যে ও সে = যে-সে

এটা আর ওটা = এটা-ওটা

যথা ও তথা = যথা-তথা

যার ও তার = যার-তার

৪. ক্রিয়াপদের দ্বন্দ্ব : যে যন্দ্ব সমাসের উভয় পদই ক্রিয়াপদ, তাকে ক্রিয়াপদের সন্দ্ব সমাস বলে। যেমন-

 এখানে এবং সেখানে = এখানে সেখানে

যাওয়া ও আসা = যাওয়া-আসা

বলা ও কওয়া = বলা-কওয়া

বাঁচা ও মরা = বাঁচা-মরা

ভাঙা ও গড়া = ভাঙা-গড়া

দেখা ও শোনা = দেখা শোনা

লেখা ও পড়া = লেখা-পড়া

৫. ক্রিয়া বিশেষণের দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসের উভয় পদই ক্রিয়া বিশেষণ, তাকে ক্রিয়া বিশেষণের বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন—

 আগে ও পিছে = আগে-পিছে

ধীরে ও সুস্থে = ধীরে-সুস্থে

পাকে ও প্রকারে = পাকে প্রকারে


কর্মধারয় সমাস

যেখানে বিশেষণ বিশেষণ বা বিশেষণভাবাপন্ন পদের সাথে বিশেষ্য বা বিশেষ্যভাবাপন্ন পদের সমাস হয় এবং পরপদের অর্থই প্রধানরূপে প্রতীয়মান হয় তাকে কর্মধারয় সমাস বলে।  যেমন: নীল যে পদ্ম = নীলপদ্ম।

কর্মধারয় সমাস কয়েক প্রকারে সাধিত হয়। যেমন:

  •  দুটি বিশেষণ পদে একটি বিশেষ্যকে বোঝালে। যেমন: যে চালাক সেই চতুর=চালাক-চতুর।
  • দুটি বিশেষ্য পদে একই ব্যক্তি বা বস্তুকে বোঝালে। যেমন: যিনি জজ তিনিই সাহেব=জজ সাহেব।
  • কার্যে পরম্পরা বোঝাতে দুটি কৃদন্ত বিশেষণ পদের কর্মধারয় সমাস হয়। যেমন: আগে ধোয়া পরে মোছা = ধোয়ামোছা।

 কর্মধারয় সমাস কয়েক প্রকার। যথা-

 

মধ্যপদলোপী কর্মধারয় শব্দযোগ উপমান কর্মধারয়   উপমিত কর্মধারয় রুপক কর্মধারয় 
যে কর্মধারয় সমাসে ব্যাসবাক্যের মধ্যপদের লোপ হয় তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস বলে।সাধারণ ধর্মবাচক পদের সাথে উপমানবাচক পদের যে সমাস হয় তাকে উপমান কর্মধারয় সমাস বলে।সাধারণ গুণের উল্লেখ না করে উপমেয় পদের সাথে উপমানের যে সমাস হয় তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলে। উপমান ও উপমেয়ের মধ্যে অভিন্নতা কল্পনা করা হলে রূপক কর্মধারয় সমাস হয়।
যেমন: স্মৃতি রক্ষার্থে সৌধ= স্মৃতিসৌধ।যেমন: তুষারের ন্যায় শুভ্র=তুষারশুভ্র।যেমন: মুখ চন্দ্রের ন্যায়= চন্দ্রমুখ।যেমন: মন রূপ মাঝি= মনমাঝি।

 

তৎপুরুষ সমাস

পূর্বপদের বিভক্তির লোপে যে সমাস হয় এবং যে সমাসে পরপদের অর্থ প্রধানভাবে বোঝায় তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: মন দিয়ে গড়া = মনগড়া। তৎপুরুষ সমাস নয় প্রকার:

  • দ্বিতীয়া তৎপুরুষ 
  • তৃতীয়া তৎপুরুষ
  • চতুর্থী তৎপুরুষ
  • পঞ্চমী তৎপুরুষ
  • ষষ্ঠী তৎপুরুষ
  • সপ্তমী তৎপুরুষ
  • নঞ্ তৎপুরুষ
  • উপপদ তৎপুরুষ
  • অলুক তৎপুরুষ

  • দ্বিতীয়া তৎপুরুষ: পূর্বপদের দ্বিতীয়া বিভক্তি (কে, রে) ইত্যাদি লোপ হয়ে যে সমাস হয় তাকে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: দুঃখকে প্রাপ্ত=দুঃখপ্রাপ্ত, বিপদকে আপন্ন=বিপদাপন্ন

তৃতীয়া তৎপুরুষউপকরণবাচক বিশেষ্য পদ পূর্বপদে বসলেও তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন: স্বর্ণ দ্বারা মণ্ডিত = স্বর্ণমণ্ডিত।

চতুর্থী তৎপুরুষপূর্বপদে চতুর্থী বিভক্তি (কে, জন্য, নিমিত্ত ইত্যাদি) লোপে যে সমাস হয় তাকে চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: গুরুকে ভক্তি = গুরুভক্তি, আরামের জন্য কেদারা= আরামকেদারা।

নঞ্ তৎপুরুষ না বাচক নঞ্ অব্যয় (না, নেই, নাই, নয়) পূর্বে বসে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে নঞ্ তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: ন আচার=অনাচার, ন কাতর=অকাতর। 

 বহুব্রীহি সমাস 

যে সমাসে সমস্যমান পদগুলোর কোনোটির অর্থ না বুঝিয়ে অন্য কোনো পদকে বোঝায় তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন: বহু ব্রীহি (ধান) আছে যার = বহুব্রীহি।

  • বহুব্রীহি সমাসে সাধারণত যার, যাতে ইত্যাদি শব্দ ব্যাসবাক্যরূপে ব্যবহৃত হয়। যেমন: আয়ত লোচন যার = আয়তলোচনা (স্ত্রী), মহান আত্মা যার= মহাত্মা।
  • সহ কিংবা সহিত শব্দের সঙ্গে অন্য পদের বহুব্রীহি সমাস হলে সহ ও সহিত এর স্থলে স হয়। যেমন: বান্ধবসহ বর্তমান = সবান্ধব।

 বহুব্রীহি সমাস আট প্রকার। যথা:

  • সমানাধিকরণ
  • ব্যাধিকরণ
  • ব্যতিহার
  • নঞ
  • মধ্যপদলোপী
  • প্রত্যয়ান্ত
  • অলুক 
  • সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি।
বহুব্রীহি সমাসের আলোচনা

সমানাধিকরণ বহুব্রীহি

            যে বহুব্রীহি সমাসে সমস্যমান পদগুলির দুটিরই বিভক্তি এক হয়, তাকে সমানাধিকরণ বহুব্রীহি বলে।

সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাসের উদাহরণ:

নীলাম্বর নীল অম্বর যাঁর

পীতাম্বর পীত অম্বর যাঁর

ছিন্ন মূল যার = ছিন্নমূল

ব্যধিকরণ বহুব্রীহি সমাস

               যে বহুব্রীহি সমাসে সমস্যমান পদগুলির বিভক্তি আলাদা হয়, অকে ব্যধিকরণ বহুব্রীহি সমাস বলে।

উদাহরণ:

বীণা পাণিতে যাঁর বীণাপাণি

চন্দ্র চূড়ায় যাঁর চন্দ্রচূড়

শশ অঙ্কে যাঁর শশাঙ্ক

শশী শিখরে যাঁর শশীশেখর

সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি সমাস

যে বহুব্রীহি সমাসের পূর্বপদে সংখ্যাবাচক বিশেষণ থাকে তাকে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি বলে।

উদাহরণ:

পঞ্চ আনন যাঁর পঞ্চানন (মানে শিব) ত্রি নয়ন যাঁর ত্রিনয়নী চতুঃ (চার) মুখ যাঁর চতুর্মুখ (মানে ব্রহ্মা) দশ আনন যাঁর দশানন সহস্র লোচন যাঁর সহস্রলোচন দশ ভুজ যাঁর দশভুজা

ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস

বহুব্রীহি সমাসের সমাসবদ্ধ পদটির দ্বারা পারস্পরিক ক্রিয়াবিনিময় বোঝালে তাকে ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস বলে।

ক্রিয়া-বিনিময় বলতে বোঝায় পরস্পর বিপরীতমুখী ক্রিয়া। একজন যদি অপরজনকে টানে অথবা একজন যদি অপরজনকে মারে, তাহলে ক্রিয়ার বিনিময় হয়। একই ভাবে অন্য কোনো কাজও যদি দুজন কর্তা পরস্পর বিপরীতমুখে করে, তবে ঐ কাজের নামটি ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস হবে। এই সমাসে সমস্তপদ গঠিত হয় প্রায় একই উচ্চারণ-বিশিষ্ট দুটি শব্দের যোগে। শব্দ দুটি সাধারণভাবে একই মূল শব্দ থেকে সৃষ্ট হয়। যেমন: লাঠালাঠি সমস্ত পদটি লাঠা' ও 'লাঠি' শব্দের যোগে তৈরি হয়েছে। এই দুটি শব্দই এসেছে মূল শব্দ 'লাঠি থেকে।
ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাসের উদাহরণ:

পরস্পর চুল আকার্ষণ করে যে ঝগড়া চুলোচুলি

লাঠিতে লাঠিতে যে লড়াই = লাঠালাঠি

হাতে হাতে যে লড়াই - হাতাহাতি

পরস্পর তর্ক করে যে বিবাদ = তর্কাতর্কি

পরস্পরকে বলে যে ক্রিয়া বলাবলি

না বহুব্রীহিন বহুব্রীহি

যে বহুব্রীহি সমাসের পূর্বপদে 'নেই' শব্দ এবং পরপদে বিশেষ্য থাকে, তাকে নঞ্চ বহুব্রীহি বা না বহুব্রীহি বলে।

মনে রাখতে হবে, ব্যাসবাক্যের 'নেই' শব্দ সমস্তপদে না-বাচক উপসর্গ রূপে থাকে।

নঞ্চ বহুব্রীহি সমাসের উদাহরণ:

নেই ধন যার: নির্ধন

নেই বোধ যার: নির্বোধ

নেই পুত্র যার: অপুত্রক

নেই বল যার (স্ত্রী): অবলা

নেই বোল যার: অবোলা (অবোলা প্রাণী, অবলা' নয়)

ন.ঞ বহুব্রীহি সমাসের সমস্তপদটি সাধারণত বিশেষণ হয়।

অলোপ বহুব্রীহি সমাস:

বহুব্রীহি সমাসের সমস্যমান পদের বিভক্তি যদি সমস্তপদেও অক্ষুন্ন থাকে তবে ঐ বহুব্রীহি সমাসকে অলোপ বহুব্রীহি সমাস বলে

যেমন:

মুখে ভাত দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে: মুখে ভাত

হাতে খড়ি দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে: হাতেখড়ি

সহার্থক বহুব্রীহি সমাস

সহিতার্থক পদের সাথে বিশেষ্য পদের বহুব্রীহি সমাসকে সহার্থক বহুব্রীহি বলে। এই সমাসে পরপদটির সাথে কোনো কিছুর অবস্থিতি বোঝায়

উদাহরণ:

স্ত্রীর সহিত বর্তমান: সস্তীক

পুত্রের সহিত বর্তমান: সপুত্র

পরিবারের সহিত বর্তমান: সপরিবার

অবধানের সহিত বর্তমান: সাবধান

তর্কের সহিত বর্তমান: সতর্ক

অর্থের সহিত বর্তমান: সার্থক

মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস

যে বহুব্রীহি সমাসের ব্যাসবাক্যে মধ্যপদের আগমন ঘটে এবং সমস্তপদে মধ্যপদটি লোপ পায়, তাকে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস বলে।

উদাহরণ:

মীনের অক্ষির ন্যায় অক্ষি যার: মীনাক্ষী

মৃগের নয়নের ন্যায় নয়ন যার: মৃগনয়না

চিরুনির দাঁতের ন্যায় দাঁত যার: চিরুনদাঁতী




অব্যয়ীভাব সমাস 

অব্যয়ীভাব সমাস  :-  যে সমাসে পূর্বপদ অব্যয়ের  সঙ্গে পরপদ বা উত্তরপদ  বিশেষ্যের সমাস নিষ্পন্ন হয়,তাকে অব্যয়ীভাব সমাস  বলে ।    

সমস্ত-পদটি অব্যয়ের           ভাব  প্রাপ্ত   হয়   বলিয়াই    নাম  অব্যয়ীভাব ।         
                              
সংস্কৃতে   সামীপ্য,  অভাব , বীপ্সা, অনতিক্রম, সাদৃশ্য, সীমা, যোগ্যতা, ক্ষুদ্রতা, সম্মুখ, পশ্চাৎ, বিরুদ্ধতা প্রভৃতি  বিবিধ  অর্থে  অব্যয়ীভাব সমাস হয় ।বাংলা অব্যয়ীভাব সমাসেও  এগুলোই ব্যবহৃত হয় ।

যেমন :-  'সামীপ্য'-অর্থে  :-' কূলের ' 'সমীপে ' =উপকূল ;
'অক্ষির'  ' সমীপে '  =  সমক্ষ  ;    
'নগরীর '  'সমীপে ' =  উপনগরী; 'নদীর '  'সমীপে '= উপনদী

অভাব-অর্থে :-      কসুরের '  'অভাব '= বেকসুর;
'ভাতের '  ' অভাব '   =  হাভাত ;
'অর্থের '  'অভাব '  =  অনর্থ  ;
'মিলের'   ' অভাব '   =  গরমিল;
'ভিক্ষার '  ' অভাব '  =  দুর্ভিক্ষ; 

'বিঘ্নের '   'অভাব '  =   নির্বিঘ্ন ।


'বীপ্সা '(পুনঃ পুনঃ ) -অর্থে :-  দিনে     দিনে  =প্রতিদিন
জনে        জনে   =প্রতিজন ,জনপিছু,  জনপ্রতি  ।
রোজ     রোজ   =  হররোজ;
মাসে      মাসে   =  প্রতিমাসে, মাসপ্রতি , ফিমাস ;
বছর     বছর   =  ফিবছর ।



'বিপরীত '-অর্থে  :-  হিংসার    বিপরীত  =  প্রতিহিংসা  ;
কূলের      বিপরীত   =  প্রতিকূল  ;
পক্ষের      বিপরীত    =  প্রতিপক্ষ  ;
ফলের       বিপরীত   =  প্রতিফল  ;
আঘাতের      বিপরীত   =  প্রতিঘাত  ।


অনতিক্রম  ( অতিক্রম  না করে )-অর্থে  :- 

রীতিকে   অতিক্রম  না  করে=  যথারীতি  ;
শক্তিকে   অতিক্রম  না  করে  =  যথাশক্তি ;
নিয়মকে   অতিক্রম   না   করে    =  যথানিয়ম  বা  নিয়মমাফিক  ;
ক্রমকে   অতিক্রম   না   করে   =  যথাক্রম ;
সাধ্যকে   অতিক্রম   না   করে   =  যথাসাধ্য ।


সাদৃশ্য - অর্থে  :-  আখ্যানের   সদৃশ  =  উপাখ্যান ;
অধ্যক্ষের    সদৃশ   =  উপাধ্যক্ষ ;
বনের    সদৃশ   =  উপবন  ;
দ্বীপের    সদৃশ   =  উপদ্বীপ  ;
নদীর    সদৃশ   =  উপনদী  ;
ধ্বনির    সদৃশ   =  প্রতিধ্বনি  ;
ভাষার    সদৃশ   =  উপভাষা ।


সীমা  ও  ব্যাপ্তি -অর্থে :-  বাল্য    হইতে   =  আবাল্য  ;
  কণ্ঠ    পর্যন্ত   =  আকণ্ঠ  ;
জীবন    পর্যন্ত   =  আজীবন  ;
পদ    হইতে    মাথা   পর্যন্ত   =   আপাদমস্তক  ;
বালক  হইতে বৃদ্ধ ও বনিতা পর্যন্ত  =  আবালবৃদ্ধবনিতা  ।


ক্ষুদ্রতা-অর্থে:-  ক্ষুদ্র    গ্রহ   =  উপগ্রহ  ;
ক্ষুদ্র     শাখা   =  প্রশাখা  ;
ক্ষুদ্র      জাতি   =  উপজাতি  ;
ক্ষুদ্র       বন   =  উপবন  ;
ক্ষুদ্র      সাগর   =  উপসাগর   ;
ক্ষুদ্র        বিভাগ    =  উপবিভাগ ;
ক্ষুদ্র       অঙ্গ   =  প্রত্যঙ্গ  ।


যোগ্যতা -অর্থে  :-  গ্রহনের       যোগ্য   =  অনুগ্রহ  ;
রূপের      যোগ্য   =  অনুরূপ  ;
গুণের       যোগ্য    =  অনুগুণ ।


সম্মুখ -অর্থে  :-  অক্ষির       সম্মুখে    =  প্রত্যক্ষ  ;
 কূলের       সম্মুখে    =  অনুকূল  ।


পশ্চাৎ -অর্থে  :-  গমনের       পশ্চাৎ   =  অনুগমন  ;
ইন্দ্রের      পশ্চাৎ     =  উপেন্দ্র  ; 
করণের      পশ্চাৎ   =  অনুকরণ ;
স্মরণের      পশ্চাৎ    =   অনুস্মরণ ।


 বিবিধ -অর্থে  :-  শৃঙ্খলাকে      অতিক্রান্ত = উচ্ছৃঙ্খল;
বাস্তু   হইতে  উৎখাত  =  উদ্বাস্তু ;
বেলাকে    অতিক্রান্ত   =  উদ্বেল  ;
দৈবকে  অধিকার   করিয়া    =  অধিদৈব ;
ঝুড়িকে    বাদ  না   দিয়া    =  ঝুড়িসুদ্ধ  ;
পিতামহের   পূর্বে    =  প্রপিতামহ  ;
পৌত্রের   পরে     =  প্রপৌত্র ;
দস্তুর    অনুযায়ী      =  দস্তুরমত ।











কোন মন্তব্য নেই

ok

4x6 থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.