ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ
ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ
ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ
ভাষা একটি জীবন্ত সত্তা। মানুষের সামাজিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ভাষারও পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তন শব্দ, অর্থ, রূপ, বাক্যগঠন ইত্যাদি স্তরে যেমন ঘটে, তেমনি ঘটে ধ্বনিগত স্তরেও। সময়ের প্রবাহে, উচ্চারণের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে বা সামাজিক প্রভাবে শব্দের ধ্বনিতে যে পরিবর্তন ঘটে, তাকে বলা হয় ধ্বনি পরিবর্তন। ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি একটি স্বাভাবিক ও অবশ্যম্ভাবী প্রক্রিয়া।
ধ্বনি পরিবর্তনের সংজ্ঞা
ধ্বনি পরিবর্তন বলতে বোঝায় — সময়ের সঙ্গে বা কোনো প্রভাবের ফলে একটি ধ্বনির রূপান্তর, লোপ, সংযোজন, বা অবস্থান পরিবর্তন। অর্থাৎ কোনো শব্দের পুরনো রূপ থেকে তার নতুন রূপের মধ্যে যে ধ্বনিগত পার্থক্য দেখা যায়, সেটিই ধ্বনি পরিবর্তনের ফল।
উদাহরণ:
“অগ্নি” → “আগুন”, “গৃহ” → “ঘর”, “সপ্তমী” → “সতমী” ইত্যাদি।
ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ
১. উচ্চারণের সহজতা বা স্বাভাবিক প্রবণতা
মানুষ উচ্চারণে স্বাভাবিকতা ও সহজতা চায়। জটিল বা কঠিন ধ্বনি সহজ করে বলা হয়। এ কারণে শব্দের কিছু ধ্বনি বাদ পড়ে যায় বা রূপান্তরিত হয়।
উদাহরণ:
‘গৃহ’ → ‘ঘর’, ‘অগ্নি’ → ‘আগুন’।
২. পাশের ধ্বনির প্রভাব (Assimilation)
একটি ধ্বনি পাশের ধ্বনির প্রভাবে নিজের রূপ পরিবর্তন করে। এটি ধ্বনি পরিবর্তনের অন্যতম সাধারণ কারণ।
উদাহরণ:
‘সপ্তমী’ → ‘সতমী’, ‘উদ্ঘাটন’ → ‘উঘাটন’।
৩. ধ্বনির লোপ (Elision)
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোনো ধ্বনি উচ্চারণ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এটি ভাষার প্রাকৃতিক বিবর্তনের অংশ।
উদাহরণ:
‘উদ্বোধন’ → ‘বোধন’।
৪. ধ্বনির সংযোজন (Addition)
কখনও উচ্চারণে স্বাচ্ছন্দ্য আনার জন্য অতিরিক্ত ধ্বনি যুক্ত হয়।
উদাহরণ:
‘অস্ত’ → ‘আস্ত’, ‘অনু’ → ‘অন্নু’ (লোক উচ্চারণে)।
৫. ধ্বনির অদলবদল (Metathesis)
ধ্বনির অবস্থান পরিবর্তনের ঘটনাকে বলা হয় অদলবদল। এটি সাধারণত দ্রুত উচ্চারণের ফলে ঘটে।
উদাহরণ:
‘পতঙ্গ’ → ‘পাতঙ্গ’, ‘ত্রৈলোক্য’ → ‘তৈলক্য’।
৬. বিদেশি ভাষার প্রভাব
অন্য ভাষা থেকে শব্দ ধার করার সময় মূল ধ্বনির সঙ্গে নতুন ভাষার ধ্বনিগত পার্থক্য তৈরি হয়।
উদাহরণ:
‘স্কুল’ (English school) → ‘ইস্কুল’ (বাংলা উচ্চারণে), ‘স্টেশন’ → ‘ইস্টেশন’।
৭. সামাজিক ও আঞ্চলিক প্রভাব
ভাষাভাষীর সমাজ, শ্রেণি ও অঞ্চলের প্রভাবে ধ্বনি পরিবর্তন ঘটে। বিভিন্ন অঞ্চলে এক শব্দের উচ্চারণ আলাদা হয়।
উদাহরণ:
‘বলছে’ → ‘বইতাছে’ (দক্ষিণ-পশ্চিম আঞ্চলিক রূপ)।
৮. ভাষার ঐতিহাসিক বিবর্তন
সময় ও প্রজন্মের পর প্রজন্মে ভাষার ধ্বনি স্বাভাবিকভাবেই বদলে যায়। পুরনো রূপ ক্রমে পরিবর্তিত হয়ে নতুন রূপে পরিণত হয়।
উদাহরণ:
সংস্কৃতের ‘নর’ → প্রাকৃতের ‘নারো’ → আধুনিক বাংলায় ‘নর’ বা ‘মানুষ’।
ফলাফল
ধ্বনি পরিবর্তনের ফলে ভাষা প্রাণবন্ত ও অভিযোজনক্ষম হয়। এ প্রক্রিয়া ভাষাকে স্থবিরতা থেকে রক্ষা করে এবং নতুন যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী রূপান্তরিত হতে সাহায্য করে। তবে অতিরিক্ত ধ্বনি পরিবর্তনে কখনও শব্দের মূল রূপ বা অর্থ হারিয়ে যেতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই
ok