ছোটো গল্প। নীল নীরবতা গ্রন্থী: নীলোৎপল জানা (দ্বিতীয় গল্প)
।। ছোটো গল্প।।
নীল নীরবতা
গ্রন্থী: নীলোৎপল জানা (দ্বিতীয় গল্প)
(বিষয়: বিবাহ-বিচ্ছেদ, ভালোবাসা ও জীবনের নতুন অর্থ)
প্রথম : নীল নীরবতা
অরিজিৎ আর মিতা— কলেজের বন্ধু। ক্লাসে প্রথম দেখা, তারপর ক্যান্টিনে চা, বৃষ্টিভেজা বিকেলে বই ভাগাভাগি করে পড়া। বন্ধুত্বটা এমন এক জায়গায় গিয়েছিল যেখানে “তুই ভালো আছিস?” মানেই ছিল একে অপরের জীবনের মাপকাঠি।
বছর দু’য়েক পর সেই বন্ধুত্বেরই রূপ নিল ভালোবাসায়। কেউ কাউকে প্রস্তাব দেয়নি; একদিন হঠাৎ বৃষ্টির দিনে, মিতা বলেছিল—
“তুই ছাড়া আমি বাঁচব না।”
অরিজিৎ হেসে উত্তর দিয়েছিল—
“আমিও তাই ভাবি, তুই না থাকলে কথাগুলো কার সঙ্গে শেয়ার করব?”
ওদের বিয়েটা হল সাদামাটা, কিন্তু মনে ছিল আনন্দ। প্রথম ক’মাসে ওদের সংসার ছিল একেবারে রঙিন—ঝগড়া, অভিমান, মিলন—সবকিছুতেই ছন্দ ছিল। কথায় কথায় মন খারাপ হতো, কিন্তু রাতে বিছানায় হাত ধরলেই সব মুছে যেত। ওরা একে অপরের শরীরের সঙ্গে যেমন পরিচিত ছিল, তেমনি পরিচিত ছিল মনের প্রতিটি বাঁকে।
তারপর ধীরে ধীরে ওরা অপেক্ষা করতে লাগল—একটা নতুন জীবনের জন্য। এক বছর গেল, দুই বছর গেল। কোনো খবর নেই। মিতা যেন কেমন চুপচাপ হয়ে গেল। অরিজিৎ একদিন বলল- “চলো, ডাক্তার দেখাই।”
ডাক্তারের ঘরে বসে থাকা সময়টা যেন থেমে থাকা বাতাসের মতো ভারী। শেষে রিপোর্ট এলো—
ডাক্তার বললেন- (ধীরে) “মিতা, আপনার গর্ভধারণের সম্ভাবনা নেই।”
মিতা কিছু বলেনি। শুধু ঠোঁটের কোণে একটুকরো কষ্টের হাসি ঝুলে ছিল। অরিজিৎও তখন চুপ। ঘরে ফিরে কেউ কথা বলেনি।
এরপর থেকে যেন প্রতিদিনের কথোপকথনই যুদ্ধ। মিতার চোখে অপরাধবোধ, অরিজিতের চোখে ক্লান্তি। ছোট ছোট বিষয়েও ঝগড়া। একদিন মিতা বলেছিল—
“তুই নিশ্চয়ই ভাবিস, আমি অসম্পূর্ণ!”
অরিজিৎ চিৎকার করে উঠেছিল—“আমি তো শুধু একটা সন্তান চেয়েছিলাম, এতটা দূরত্ব নয়!”
সেই রাতে ওরা এক বিছানায় থেকেও একে অপরকে ছোঁয়নি। ঘরের বাতাস ছিল ঠান্ডা, তবু ঘামছিল দুজনেই।
মাস কয়েক পর, এক সকালে মিতা অরিজিতের জন্য চা বানিয়ে রেখে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। টেবিলের ওপর লিখে রাখা ছিল কাগজের একটা টুকরো—“তুই ভালো থাক। আমি তোর দুঃখের কারণ হয়ে থাকতে চাই না।”
অরিজিৎ কাগজটা হাতে নিয়ে চুপ করে বসেছিল অনেকক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে জানলার দিকে তাকিয়ে বলেছিল— “আমরা দু’জনেই হারিনি, শুধু হারিয়ে গেছি নিজেদের ভেতর।”
বছর কেটে গেছে। অরিজিৎ আজও রাতে বিছানায় গেলে হাত বাড়ায়—যেন অভ্যাসবশে, অদৃশ্য এক উপস্থিতিকে ছোঁয়ার জন্য।
বালিশের পাশে এখনো পড়ে আছে মিতার চুলের একটা সুগন্ধি ক্লিপ—
নিস্তব্ধ, অথচ জীবন্ত।
দ্বিতীয় : নতুন জীবন
তিন বছর কেটে গেছে মিতা চলে যাওয়ার পর।
অরিজিৎ এখন একা থাকে দক্ষিণ কলকাতার ফ্ল্যাটে। অফিস থেকে ফিরে কফি বানায়, পুরোনো গানের রেকর্ড চালায়, কিন্তু ঘরটা যেন শব্দহীন। মিতার রেখে যাওয়া জিনিসপত্র সে সরায়নি—ড্রয়ারে এখনো আছে সেই গোলাপি চুলের ক্লিপটা, টেবিলের ওপর রাখা আছে মিতার প্রিয় উপন্যাস “শেষের কবিতা”।
একদিন অফিসে নতুন এক সহকর্মী এল—রেখা। শান্ত, মৃদুভাষী, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। ধীরে ধীরে ওদের মধ্যে কথা বাড়ল। একদিন রেখা অরিজিতকে নিয়ে গেল একটি শিশু-অভয়াশ্রমে। সেখানে এক ছোট্ট মেয়ে মীনা, অরিজিতের হাত ধরে টান দিল—“আমাকে গল্প শোনাও না, কাকু!”
সেই বিকেলটা যেন অরিজিতের চোখে জল এনে দিল—কিন্তু সেই জল ছিল শান্তির।
কিছুদিন পর, সে মীনাকে দত্তক নিল।
হঠাৎ একদিন, দরজায় বেল বাজল। দরজা খুলে দেখল—মিতা দাঁড়িয়ে আছে।(এটা ভাবতেই পারেনি অরিজিৎ)
মীনা দৌড়ে এসে বলল, “বাবা, কে এলো?”
মিতা হেসে বলল, “তোমার মা’র এক পুরোনো বন্ধু।”
সন্ধেটা তিনজন একসঙ্গে কাটাল।
মিতা বলল- “তুমি তো বেশ ভালো আছ।”
অরিজিৎ উত্তর দিল- “এখন একটু শান্তিতে আছি। জীবনের মানে নতুন করে শিখছি।”
মিতা শুধু বলল, “আমরা হারাইনি, অরিজিৎ। শুধু ঠিকঠাক জায়গায় পৌঁছাতে সময় লেগেছে।”
জানলার বাইরে নীল নীরবতা—
কিন্তু আজ সে নীরবতায় একটা কোমল সুর বেজে উঠছে।
শেষ : ফিরে পাওয়া আলো
শীতের সকাল। জানলার কাঁচে রোদের হালকা ছায়া পড়েছে। মীনা স্কুলের জন্য ব্যাগ গোছাচ্ছে, আর অরিজিৎ অফিসের নথি দেখছে।
সেই থেকে মিতা মাঝে মাঝে আসে। কখনও মীনার সঙ্গে ছবি আঁকে, কখনও রান্নাঘরে অরিজিতের জন্য চা বানিয়ে দেয়।
একদিন বিকেলে মিতা এল হাতে ছোট্ট একটা চারা গাছ নিয়ে।
বলল, “তোমাদের বারান্দায় বসাই না? নাম রাখব ‘নীলিমা’। মানে, নীল আকাশের মতো শান্ত।”
রাতে মিতা বলল, “আমি ভাবতাম আমি শেষ হয়ে গেছি। কিন্তু তুই, তোর এই জীবন—আমাকে বুঝিয়েছে, শেষ বলে কিছু নেই। শুধু নতুন শুরু আছে।”
অরিজিৎ উত্তর দিল, “তুই তো হয়েছিস, মিতা। মা হওয়ার মানে তো শুধু জন্ম দেওয়া নয়। ভালোবাসা দিয়েও মানুষ জন্ম পায়।”
কিছুদিন পর, মীনার স্কুলে বাৎসরিক অনুষ্ঠানে মিতা ও অরিজিৎ দুজনেই গেল।
মীনা মঞ্চে বলল, “আমি আমার বাবা-মাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই—কারণ ওরা দুজনেই আমাকে ভালোবাসা কী, সেটা শিখিয়েছে।”
অরিজিৎ মিতার হাত চেপে ধরল— সেই চেনা উষ্ণতা, কিন্তু নতুন শান্তি।
কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, শুধু এক নিঃশব্দ বোঝাপড়া।
রাতের শেষে, তিনজন মিলে বারান্দায় দাঁড়াল।
‘নীলিমা’ গাছের নতুন পাতা বাতাসে দুলছে।
মীনা বলল, “দেখো বাবা, আমাদের গাছটা বড় হচ্ছে।”
অরিজিৎ উত্তর দিল, “হ্যাঁ রে মা , ঠিক আমাদের মতোই।”
আকাশে তখন পূর্ণ চাঁদ—
নীল নীরবতার মাঝে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে, যেন বলছে—“শেষ নয়, এই তো শুরু...
"পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি ,
আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী।''
============================
সকল পাঠকের কাছে আমার অনুরোধ গল্পটি পড়ার পর ভালো-মন্দ কমেন্ট লিখবেন; তার কারণ এটা আপনাদের কাছ থেকে পাওয়া একটা অনুপ্রেরণা। এই গল্পটি আমার লেখা দ্বিতীয় গল্প।২৮/১০/২০২৫


কোন মন্তব্য নেই
ok