Translate

পাড়ি:রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ; সম্পাদক: ড. নীলোৎপল জানা

 



বলাকা কাব্য

========================================

৫ সংখ্যক

পাড়ি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

----------------------------------------------

মত্ত সাগর দিল পাড়ি গহন রাত্রিকালে

ওই-যে আমার নেয়ে।

ঝড় বয়েছে, ঝড়ের হাওয়া লাগিয়ে দিয়ে পালে আসছে তরী বেয়ে।

কালো রাতের কালি-ঢালা ভয়ের বিষম বিযে আকাশ যেন মূর্ছি পড়ে সাগর-সাথে মিশে;

উতল ঢেউয়ের দল খেপেছে, না পায় তারা দিশে-উধাও চলে ধেয়ে।

হেনকালে এ দুর্দিনে ভাবল মনে কী সে

কূল-ছাড়া মোর নেয়ে?

 

এমন রাতে উদাস হয়ে কেমন অভিসারে

আসে আমার নেয়ে?

সাদা পালের চমক দিয়ে নিবিড় অন্ধকারে আসছে তরী বেয়ে।

কোন্ ঘাটে যে ঠেকবে এসে কে জানে তার পাতি, পথ-হারা কোন্ পথ দিয়ে সে আসবে রাতারাতি,

কোন্ অচেনা আঙিনাতে তারি পূজার বাতি

রয়েছে পথ চেয়ে?

অগৌরবার বাড়িয়ে গরব করবে আপন সাথী

বিরহী মোর নেয়ে।

 

এই তুফানে এই তিমিরে খোঁজে কেমন খোঁজা বিবাগ্মী মোর নেয়ে?

নাহি জানি পূর্ণ ক'রে কোন্ রতনের বোঝা আসছে তরী বেয়ে।

নহে নহে, নাইকো মানিক, নাই রতনের ভার-

একটি ফুলের গুচ্ছ আছে রজনীগন্ধার,

সেইটি হাতে আঁধার রাতে সাগর হবে পার

আনমনে গান গেয়ে।

কার গলাতে নবীন প্রাতে পরিয়ে দেব হার

নবীন আমার নেয়ে?

 

সে থাকে এক পথের পাশে, অদিনে যার তরে

বাহির হল নেয়ে।

তারি লাগি পাড়ি দিয়ে সবার অগোচরে

আসছে তরী বেয়ে।

রুক্ষ অলক উড়ে পড়ে, সিক্তপলক আঁখি,

ভাঙা ভিতের ফাঁক দিয়ে তার বাতাস চলে হাঁকি,

দীপের আলো বাদল-বায়ে কাঁপছে থাকি থাকি

ছায়াতে ঘর ছেয়ে।

তোমরা যাহার নাম জান না তাহারি নাম ডাকি

ওই-যে আসে নেয়ে।

 

অনেক দেরি হয়ে গেছে, বাহির হল কবে

উন্মনা মোর নেয়ে।

এখনো রাত হয় নি প্রভাত, অনেক দেরি হবে

আসতে তরী বেয়ে।

বাজবে নাকো তুরী ভেরী, জানবে নাকো কেহ-

কেবল যাবে আঁধার কেটে, আলোয় ভরবে গেহ-

দৈন্য যে তার ধন্য হবে, পূণ্য হবে দেহ

পুলক-পরশ পেয়ে।

নীরবে তার চিরদিনের ঘুচিবে সন্দেহ,

কূলে আসবে নেয়ে।

 

"পাড়ি": অন্তর্নিহিত অর্থ ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপট

[রবীন্দ্রনাথের "পাড়ি" কবিতা ও ১৯১৪-র প্রেক্ষাপট: এক অন্তর্লীন যোগসূত্র]

   "পাড়ি" কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের "বলাকা" কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত — এমন এক কাব্যগ্রন্থ, যার রচনাকাল মূলত ১৯১৪-১৯১৬ সাল, অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক সেই সময়টা। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট মাথায় রাখলে কবিতাটির আপাত-প্রেমমূলক বা রহস্যময় আধ্যাত্মিক আবরণের ভেতরে এক গভীরতর ঐতিহাসিক-দার্শনিক বার্তা খুঁজে পাওয়া যায়।

   ঝড়-রাত্রি: যুদ্ধ-বিধ্বস্ত সভ্যতার প্রতীক

কবিতার শুরুতেই আমরা দেখি — 

"মত্ত সাগর দিল পাড়ি গহন রাত্রিকালে", 

"ঝড় বয়েছে", "কালো রাতের কালি-ঢালা ভয়ের বিষম বিষে আকাশ যেন মূর্ছি পড়ে সাগর-সাথে মিশে"। ১৯১৪ সালে ইউরোপ জুড়ে যে মহাযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা রবীন্দ্রনাথের কাছে ছিল ঠিক এমনই এক "মত্ত সাগর" — এক অন্ধকার, বিভীষিকাময় ঝড়, যেখানে সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতা নিজেই নিজের তৈরি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জাতীয়তাবাদের অহংকে নিয়ে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েছিল। "উতল ঢেউয়ের দল খেপেছে, না পায় তারা দিশে-উধাও চলে ধেয়ে" — এই পঙ্‌ক্তি যেন সেই সময়কার ইউরোপীয় শক্তিগুলোর দিশাহীন, লক্ষ্যচ্যুত সংঘাতেরই প্রতিচ্ছবি। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে তাঁর বিখ্যাত "Nationalism" প্রবন্ধ ও বক্তৃতামালায় (যা এই সময়েরই চিন্তার ফসল) পাশ্চাত্য জাতীয়তাবাদকে ঠিক এই ভাষাতেই বর্ণনা করেছিলেন — এক আত্মধ্বংসী, নিয়ন্ত্রণহীন শক্তি, যা মানবতাকে গ্রাস করছে।

নেয়ে: এক নতুন যুগের বার্তাবাহক

   এই তুমুল অন্ধকারেও একটি "তরী" পাড়ি দিচ্ছে — 

"সাদা পালের চমক দিয়ে নিবিড় অন্ধকারে আসছে তরী বেয়ে"। 

এই নেয়ে (মাঝি) কে? কবিতায় সে অনির্দিষ্ট, রহস্যময়, "বিরহী", "উদাস", "অভিসারী"। প্রতীকী অর্থে এই নেয়েকে আমরা এক নতুন যুগের, নতুন চেতনার দূত হিসেবে পড়তে পারি — যে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত পৃথিবীর মধ্য দিয়ে এক নতুন মানবিক ভবিষ্যতের বার্তা নিয়ে আসছে। যুদ্ধের কোলাহলের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন যে ইতিহাসের এই তমসাচ্ছন্ন রাত্রি চিরস্থায়ী নয়; তার ভেতর দিয়েই এক নতুন প্রভাত আসন্ন, যদিও তার পথ ও গন্তব্য অস্পষ্ট — "কোন্ ঘাটে যে ঠেকবে এসে কে জানে তার পাতি, পথ-হারা কোন্ পথ দিয়ে সে আসবে রাতারাতি"।

রত্ন নয়, রজনীগন্ধা: বস্তুবাদের বিরুদ্ধে মানবিক আদর্শ

   কবিতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ সম্ভবত এইখানে — 

"নহে নহে, নাইকো মানিক, নাই রতনের ভার-

একটি ফুলের গুচ্ছ আছে রজনীগন্ধার"। 

মাঝি সোনা-রূপা, রত্ন-মণিমাণিক্যের ভার বহন করে আসছে না; তার কাছে আছে শুধু এক গুচ্ছ রজনীগন্ধা — সামান্য, কোমল, অথচ সুরভিত। এখানে যুদ্ধরত ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী, অস্ত্র-নির্ভর, সম্পদ-লোভী সভ্যতার বিপরীতে রবীন্দ্রনাথ স্থাপন করছেন এক বিকল্প মূল্যবোধ — প্রেম, সৌন্দর্য ও সারল্যের মূল্যবোধ। যুদ্ধ যখন "রতনের বোঝা" অর্থাৎ ক্ষমতা, উপনিবেশ, অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে লড়ছে, তখন কবির কাছে প্রকৃত সম্পদ একটিমাত্র ফুলের গুচ্ছ — অর্থাৎ মানবিকতা ও সৌন্দর্যবোধ, যা প্রকৃত সভ্যতার ভিত্তি হওয়া উচিত। এই ভাবনারই বিস্তৃত রূপ আমরা পাই তাঁর "ঘরে বাইরে" উপন্যাসে (রচনাকাল ১৯১৫-১৬), যেখানে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও প্রকৃত মানবিক আদর্শের দ্বন্দ্ব একই সুরে চিত্রিত হয়েছে।

অপেক্ষমাণ, অচেনা ঠিকানা: উপনিবেশিত মানুষের প্রতীক্ষা

  "সে থাকে এক পথের পাশে, অদিনে যার তরে

 বাহির হল নেয়ে"

 — যার জন্য এই যাত্রা, সে থাকে এক প্রান্তিক, ভাঙা ঘরে — "ভাঙা ভিতের ফাঁক দিয়ে তার বাতাস চলে হাঁকি"। এই দরিদ্র, প্রান্তবাসী প্রতীক্ষমাণ চরিত্রটিকে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষ বা বৃহত্তর পরাধীন প্রাচ্যের রূপক হিসেবেও পড়া যায় — যে বিশ্বযুদ্ধের কোলাহলের মধ্যে নীরবে নিজের মুক্তি বা নবজাগরণের প্রতীক্ষা করছে। "দৈন্য যে তার ধন্য হবে, পূণ্য হবে দেহ" — এই পঙ্‌ক্তিতে দারিদ্র্য ও প্রান্তিকতাই ধন্য ও পুণ্যে রূপান্তরিত হওয়ার আশ্বাস আছে, যা ঔপনিবেশিক শোষণের যুগে আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ মুক্তির প্রতি কবির গভীর বিশ্বাসেরই প্রতিফলন।

সমাপ্তিতে আশাবাদ: গতিবাদের দর্শন

   কবিতাটি শেষ হচ্ছে এক প্রশান্ত আশাবাদে — 

    "নীরবে তার চিরদিনের ঘুচিবে সন্দেহ,

    কূলে আসবে নেয়ে।" 

যতই দেরি হোক, যতই অনিশ্চয়তা থাকুক, শেষ পর্যন্ত আলো আসবে, তরী কূলে ভিড়বে। এটিই "বলাকা" কাব্যগ্রন্থের কেন্দ্রীয় দর্শন — "গতিবাদ" (dynamism) — স্থবিরতা নয়, বরং চিরন্তন গতির মধ্য দিয়েই সৃষ্টি এগিয়ে চলে, ধ্বংসের মধ্যেও নবনির্মাণের বীজ লুকিয়ে থাকে। যুদ্ধ যতই বিভীষিকাময় হোক, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন যে মানবসভ্যতা এই অন্ধকার সাগর পাড়ি দিয়ে একদিন এক নতুন, মানবিক প্রভাতে পৌঁছাবে।

    সুতরাং "পাড়ি" কবিতাটিকে নিছক এক রহস্যময় প্রেম বা আধ্যাত্মিক অভিসারের কবিতা হিসেবে না দেখে, ১৯১৪ সালের বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ব ও যুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপটে পড়লে তা হয়ে ওঠে এক যুগসন্ধিক্ষণের রূপক-চিত্র — যেখানে ঝড়-রাত্রি হলো যুদ্ধবিধ্বস্ত সভ্যতা, নেয়ে হলো আসন্ন নতুন মানবিক চেতনার দূত, রত্নহীন রজনীগন্ধা হলো বস্তুবাদের বিরুদ্ধে প্রেম ও সারল্যের আদর্শ, আর অপেক্ষমাণ প্রান্তবাসী চরিত্রটি হলো পরাধীন, প্রতীক্ষারত মানবতা। এইভাবেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর ব্যক্তিগত-আধ্যাত্মিক কাব্যভাষাকে যুগযন্ত্রণার সর্বজনীন বার্তায় রূপান্তরিত করেছেন।

কোন মন্তব্য নেই

ok

4x6 থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.