'বলাকা'র গতিতত্ত্ব : আলোচক ড. নীলোৎপল জানা
‘বলাকা’ কাব্যের গতিতত্ত্ব
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দার্শনিক কাব্যচেতনার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থ থেকেই। এই কারণেই রবীন্দ্র-সাহিত্যে ‘বলাকা’ একটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। ‘বলাকা’ কাব্যের প্রায় প্রতিটি কবিতায়ই অবিরাম চলার কথা, অর্থাৎ গতির আরাধনা, সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে এই গতিবাদ ‘বলাকা’-পর্বে কবির সম্পূর্ণ নতুন কোনো উপলব্ধি নয়। তাঁর কৈশোর থেকেই কবিতায় গতি-চেতনার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। কবি অল্পবয়সেই উপলব্ধি করেছিলেন—জীবজগৎ ও জড়জগৎ, উভয়ের মধ্যেই অবিশ্রাম গতি বিদ্যমান। পূর্ববর্তী কাব্যেও তিনি ‘আগে চলা’-র কথা বলেছেন, কিন্তু ‘বলাকা’ পর্যায়ে এসে এই গতিবাদ একটি নতুন বেগ, গভীরতা ও দার্শনিক রূপ লাভ করেছে। কবি যেন এখানে উপলব্ধি করেছেন—গতির মধ্যেই প্রাণশক্তির বিকাশ ও জীবনের সার্থকতা।
এই ভাবনার প্রকাশ আমরা পাই ‘চৈতালী’ কাব্যের একটি বিখ্যাত উদ্ধৃতিতে—
“যে নদী হারায়ে স্রোতচলিতে পারে সহস্র শৈবালদাম বাঁধে আসি তারে;যে জাতি জীবনহারা অচল অসাড়পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার।”
এর মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন—যে ব্যক্তি বা জাতি গতির সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করতে পারে না, তার মুক্তি অসম্ভব।
রবীন্দ্রনাথের আত্মস্বীকৃত গতিচেতনা
রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর গতিতত্ত্ব সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বলেছেন—
“তোমাদের রক্তের মধ্যে গতির অতি পুরাতন তাগিদ রয়েছে…আমার বাল্যকাল হতেই আমি গতির উপাসক।”
তিনি মনে করতেন, এই গতির তাগিদ পাশ্চাত্য মনীষীদের থেকে ধার করা নয়; বরং এটি তাঁর জন্মগত ও ভারতীয় চেতনাসঞ্জাত। যদিও পাশ্চাত্য সাহিত্যের সংস্পর্শে এসে এই অনুভূতি আরও বলবৎ হয়েছে, তবু এর মূল উৎস তাঁর নিজের জীবনবোধ ও প্রাচীন ভারতীয় দর্শন।
“আমি যাব, আমি যাব।”
এই নির্ঝরই পরবর্তীকালে ‘বলাকা’-য় নদীর রূপ ধারণ করেছে। ‘স্রোত’ কবিতায় তিনি বলেন—
“জগৎ স্রোতে ভেসে চল যে যেথা আছ ভাই,চলেছে যেথা রবি শশী চলরে সেথা যাই।”
গানেও সেই একই ব্যাকুলতা—
“ঘরের ঠিকানা হল না গোমন করিতেছে যাই যাই…”
নাটক (‘ডাকঘর’), কবিতা (‘নৈবেদ্য’), উৎসব-কাব্য (‘শরদ উৎসব’)—সর্বত্রই জীবনের এই চিরন্তন যাত্রার তাগিদ ধ্বনিত হয়েছে।
বের্গসঁর গতিবাদ ও রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথের গতিতত্ত্বের সঙ্গে পাশ্চাত্য দার্শনিক হেনরি বের্গসঁর দর্শনের মিল আছে কি না—এই প্রশ্নে কবি নিজে বলেছেন—
“প্রাণের উপর প্রাণের প্রভাব পড়বেই, নইলে সে প্রাণ নয়।”
তবু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ বের্গসঁ দ্বারা প্রভাবিত নন। এই প্রসঙ্গে শিশিরকুমার মৈত্র তাঁর ‘ধর্মতত্ত্বে রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে—
-
বের্গসঁ চরম সত্যকে কেবল গতির মধ্যেই খুঁজেছেন।
-
রবীন্দ্রনাথ গতি ছাড়াও গতির ঊর্ধ্বে এক চরম সত্যের অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন।
শিশিরকুমার মৈত্র বলেন, গতি হলো বাসনার মতো—অতৃপ্ত। যদি গতিকেই চরম সত্য ধরা হয়, তবে জীবন কখনো পূর্ণতা পায় না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করেন—বাসনা শেষ পর্যন্ত তার তৃপ্তির দিকেই ধাবিত হয়। অতএব গতি নিজে শেষ কথা নয়; গতি সত্যের পথে যাত্রামাত্র।
আনন্দ ও পূর্ণতার সন্ধান
বের্গসঁর গতি অনন্ত চলা হলেও তা লক্ষ্যহীন। রবীন্দ্রনাথের গতি কিন্তু আনন্দরস ও পূর্ণতার অভিমুখী। তাই তিনি বলেন—
“মৃত্যুর অন্তরে পশি অমৃত না পাই যদি খুঁজেসত্য যদি নাহি মেলে দুঃখ সাথে যুঝে।”
শুধু চলাই যদি লক্ষ্য হয়, তবে তা অর্থহীন ও খণ্ডিত। এই উপলব্ধির প্রকাশ ঘটে ‘তাজমহল’ কবিতায়—
“সে স্মৃতি তোমারে ছেড়ে গেছে বেড়েসর্বলোকেজীবনের অক্ষয় আলোকে।”
এখানে ব্যক্তিগত প্রেম বিশ্বমানবিক প্রেমে রূপান্তরিত হয়েছে। গতি এখানে শুধু চলা নয়—স্মৃতি, প্রেম ও চিরন্তন আনন্দের সঙ্গে মিলন।
উপসংহার
সবশেষে বলা যায়, ‘বলাকা’ কাব্যে রবীন্দ্রনাথ গতি-তত্ত্বকে সত্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেও, তিনি গতিকেই চরম বলে মানেননি। গতি তাঁর কাছে মুক্তির পথ, কিন্তু সেই মুক্তি সম্পূর্ণ হয় আনন্দ, প্রেম ও পূর্ণ সত্যের স্পর্শে। এইখানেই রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য গতিবাদকে অতিক্রম করে এক অখণ্ড মানবিক দর্শনে উপনীত হয়েছেন।

কোন মন্তব্য নেই
ok