সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রের ইতিহাসে আনন্দবর্ধন : ড. নীলোৎপল জানা
সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রের ইতিহাসে আনন্দবর্ধন
ড. নীলোৎপল জানা
ভূমিকা
সংস্কৃত অলংকার
শাস্ত্রের ইতিহাসে আনন্দবর্ধন এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্য। কাব্যের প্রকৃত স্বরূপ কী,
কবিতা কীভাবে পাঠকের হৃদয়ে অর্থ ও অনুভব সঞ্চার করে—এই মৌলিক প্রশ্নগুলির উত্তর
খুঁজতেই তাঁর চিন্তার বিস্তার। ‘ধ্বন্যালোক’ গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি কাব্যতত্ত্বে
এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন এবং ধ্বনিবাদকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। শব্দের প্রত্যক্ষ
অর্থের বাইরে যে ইঙ্গিতময়, অনুভবনির্ভর অর্থ কাজ করে, তাকেই তিনি কাব্যের প্রাণ
বলে চিহ্নিত করেন। এই আলোচনায় আনন্দবর্ধনের ধ্বনিবাদ, তাঁর রসচিন্তা এবং
‘ধ্বন্যালোক’-এর তাত্ত্বিক গুরুত্ব সংক্ষেপে কিন্তু সুসংহতভাবে তুলে ধরা হল।
ধ্বন্যালোকের
গঠন ও রচয়িতারা
‘ধ্বন্যালোক’
একটি অতি-প্রসিদ্ধ সাহিত্যতাত্ত্বিক গ্রন্থ, যার তিনটি অংশ রয়েছে—কারিকা, বৃত্তি
ও টীকা। কারিকাগুলি লিখেছেন এক অজ্ঞাতনামা ধ্বনিকার; এই শ্লোকগুলিই ‘ধ্বনি-কারিকা’
নামে পরিচিত। এই কারিকাগুলির ব্যাখ্যা বা বৃত্তি রচনা করেন আনন্দবর্ধন নিজে।
পরবর্তীকালে অভিনবগুপ্ত এই গ্রন্থের উপর একটি বিশদ টীকা লেখেন, যার নাম ‘লোচন’। এ
ছাড়াও ধ্বন্যালোকের উপর আরও কয়েকটি টীকা রচিত হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়, যদিও
সেগুলির সবকটি আজ আর সহজলভ্য নয়।
নবম
শতকের দ্বিতীয়ার্ধের আচার্য আনন্দবর্ধন কেবল তাত্ত্বিকই ছিলেন না, তিনি নিজেও
একজন কবি। তাঁর মৌলিক কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে ‘বিষম বাণলীলা’ ও ‘দেবীশতক’
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফলে তাঁর তত্ত্ব কেবল পাণ্ডিত্যনির্ভর নয়, কবি-হৃদয়ের
প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ।
ধ্বনির ধারণা
ও কাব্যের আত্মা
‘ধ্বন্যালোক’
চারটি উদ্দোত বা অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রথম অধ্যায়েই আনন্দবর্ধন মূল প্রশ্নটি
উত্থাপন করেন—ধ্বনিকে কি কাব্যের আত্মারূপে গ্রহণ করা যায়? তিনি দেখান, কাব্যের
অর্থকে কেবল লক্ষণা বা অভিধার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ করলে তার প্রকৃত স্বাদ ধরা পড়ে
না। শব্দ থেকে যে প্রত্যক্ষ অর্থবোধ জন্মায়, তা সাহিত্যবোঝার জন্য যথেষ্ট নয়।
বরং যে অর্থ অনুভবের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়, ইঙ্গিতের সাহায্যে প্রকাশিত হয়, সেই
অর্থই কাব্যের আসল শক্তি। এই প্রতীয়মান, ব্যঙ্গ্য অর্থই ধ্বনি।
আনন্দবর্ধনের
মতে ধ্বনি তিন প্রকার—বস্তুধ্বনি, অলংকারধ্বনি ও রসধ্বনি। বস্তুধ্বনিতে কোনো
বস্তু, তথ্য বা ভাব সূক্ষ্মভাবে প্রকাশিত হয়। অলংকারধ্বনিতে তুলনা বা অলংকারের
সৌন্দর্য পরোক্ষভাবে প্রকাশ পায়। আর রসধ্বনিতে কোনো গভীর মানবিক অনুভূতি বা রস
পাঠকের মনে সঞ্চারিত হয়। এই তিনের মধ্যে রসধ্বনিই সর্বশ্রেষ্ঠ, কারণ সেটিই
কাব্যকে জীবন্ত করে তোলে।
ধ্বনিবাদ ও
রসচিন্তা
আনন্দবর্ধন
স্পষ্টভাবে বলেছেন, সাধারণ অর্থ যখন ইঙ্গিতময় অর্থকে অতিক্রম করে যায়, তখনই সেই
কাব্য ধ্বনিকাব্য হয়ে ওঠে। এই সূক্ষ্ম তত্ত্ব বৈয়াকরণ বা কেবল শব্দতত্ত্ববিদের
পক্ষে বোঝা সহজ নয়, কারণ এখানে যুক্তির চেয়ে অনুভবের ভূমিকা বেশি। তিনি ধ্বনির
নানা সূক্ষ্মভেদ নিয়েও বিশদ আলোচনা করেছেন, যা তাঁর তত্ত্বের গভীরতা ও পরিণত
মননের পরিচয় দেয়।
যদিও
আনন্দবর্ধন মূলত ধ্বনিবাদের প্রবক্তা, তবু তিনি রসের গুরুত্ব অস্বীকার করেননি। বরং
রসধ্বনিকেই তিনি ধ্বনির সর্বোচ্চ রূপ হিসেবে স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে কাব্য
ব্যঙ্গ্য-প্রধান হলেও সেই ব্যঙ্গ্যের মধ্যে রসই প্রধান। বস্তুধ্বনি ও অলংকারধ্বনি
শেষ পর্যন্ত রসেরই সহায়ক; এদের মাধ্যমে কাব্য অধিকতর শোভাযুক্ত হয় এবং রসের
প্রকাশ আরও তীব্র হয়।
তিনি জোর
দিয়ে বলেছেন, গুণ, অলংকার, রীতি ও বৃত্তি—এই সব কাব্য উপাদান রসাশ্রিত। রসের
প্রকাশেই এদের সার্থকতা। অর্থাৎ কাব্যের সমস্ত কারিগরি দিক শেষ পর্যন্ত পাঠকের
হৃদয়ে রস সঞ্চারের জন্যই কার্যকর।
আনন্দবর্ধনের
অন্যান্য রচনা
অভিনবগুপ্ত আমাদের জানান যে, আনন্দবর্ধন ‘বিনিশ্চয়
টীকা’ ও ‘তত্ত্বালোক’ নামে আরও দুটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। যদিও এই গ্রন্থগুলি আজ
ততটা আলোচিত নয়, তবু এগুলি থেকে বোঝা যায় যে আনন্দবর্ধনের তাত্ত্বিক চিন্তা কেবল
‘ধ্বন্যালোক’-এই সীমাবদ্ধ ছিল না।
উপসংহার
সব মিলিয়ে আনন্দবর্ধন
ভারতীয় কাব্যতত্ত্বে এক যুগান্তকারী চিন্তাবিদ। তিনি কাব্যের আত্মা হিসেবে
ধ্বনিকে প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়েছেন যে সাহিত্য কেবল শব্দ ও অর্থের খেলা নয়, এটি
অনুভবের শিল্প। ধ্বনিবাদের মাধ্যমে তিনি কাব্যের অন্তর্নিহিত শক্তিকে চিহ্নিত
করেছেন এবং রসধ্বনির সর্বোচ্চ মর্যাদা ঘোষণা করেছেন। যদিও তিনি গৌণভাবে রসবাদী,
তবু তাঁর মূল পরিচয় ধ্বনিবাদের প্রবক্তা হিসেবেই। ‘ধ্বন্যালোক’ আজও
সাহিত্যতত্ত্বের ছাত্র ও গবেষকদের কাছে এক অপরিহার্য গ্রন্থ, আর আনন্দবর্ধন রয়ে
গেছেন সেই দীপশিখার মতো চিন্তক, যাঁর আলোয় কাব্যের গভীরতম রহস্য উদ্ভাসিত হয়।

কোন মন্তব্য নেই
ok