মিছিলের মুখ: সুভাষ মুখোপাধ্যায়
কবিতা
মিছিলের মুখ
সুভাষ মুখোপাধ্যায়
------------------------------------
'মিছিলে দেখেছিলাম একটি মুখ,
মুষ্টিবদ্ধ একটি শাণিত হাত
আকাশের দিকে নিক্ষিপ্ত,
বিস্রস্ত কয়েকটি কেশাগ্র
আগুনের শিখার মতো হাওয়ায় কম্পমান।
ময়দানে মিশে গেলেও
ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ জনসমুদ্রের ফেনিল চূড়ায়
ফসফরাসের মতো জ্বল্প করতে থাকল
মিছিলের সেই মুখ।
সভা ভেঙে গেল, ছত্রাকারে ছড়িয়ে পড়ল ভিড়
আর মাটির দিকে নামানো হাতের অরণ্যে
পায়ে পায়ে হারিয়ে গেল
মিছিলের সেই মুখ।
আজও দুবেলা পথে ঘুরি
ভিড় দেখলে দাঁড়াই
যদি কোথাও খুঁজে পাই মিছিলের সেই মুখ।
কারো বাঁশির মতো নাক ভালো লাগে
কারো হরিণের মতো চাহনি নেশা ধরায়
কিন্তু হাত তাদের নামানো মাটির দিকে,
ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সুদ্রে জ্বলে ওঠে না তাদের দৃপ্ত মুখ
ফসফরাসের মতো।
আমাকে উজ্জীবিত করে সমুদ্রের একটি স্বপ্ন
মিছিলের একটি মুখ।
অন্য সব মুখ যখন দুর্মূল্য প্রসাধনের প্রতিযোগিতায়
কুৎসিত বিকৃতিকে চাপার চেষ্টা করে,
পচা শবের দুর্গন্ধ ঢাকার জন্যে
গায়ে সুগন্ধি ঢালে,
তখন অপ্রতিদ্বন্দী সেই মুখ
নিষ্কোষিত তরবারির মতো
জেগে উঠে আমাকে জাগায়।
অন্ধকারে হাতে হাত তাই গুঁজে দিই আমি
নিষিদ্ধ এক ইস্তাহার,
জরাজীর্ণ ইমারতের ভিৎ ধ্বসিয়ে দিতে
ডাক দিই--
যাতে উদ্বেলিত মিছিলে একটি মুখ দেহ পায়
আর সমস্ত পৃথিবীর শৃঙ্খলমুক্ত ভালোবাসা
দুটি হৃদয়ের সেতুপথে
পারাপার করতে পারে।
=======================
আলোচনা
মিছিলের মুখ: সুভাষ মুখোপাধ্যায়
নতুন দেশ-নায়কের সন্ধানে।
বাংলা কাব্য জগতে চল্লিশের দশকের কবি হলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। কবিতায় যাঁরা কম্যুনিষ্ট আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাদের মধ্যে অন্যতম। রাজনৈতিক চিন্তা চেতনার বীজ বুনে কবিতাকে পার্টির ইস্তাহার নয়, শিল্পের বিচারে উত্তীর্ণ করার সকল প্রয়াস, অন্তত এই কবিতায় লক্ষ্য করা যায়।
কুয়াশা কঠিন বাসর হে সম্মুখে।
লাল উল্কিতে পরস্পরকে চেনা-
দলে টানো হতবুদ্ধি ত্রিশঙ্কুকে,
কমরেড আজ নবযুগ আনবে না?’
‘শপথ আমার; মৃত্যুর সাথে একটি কড়ার
আত্মদানের স্বপ্ন একটি পৃথিবী গড়ার।‘
বিস্রস্ত কয়েকটি কেশাগ্র
আগুনের শিখার মত হাওয়ায় কম্পমান।
ময়দানে মিশে গেলেও
ঝঞ্জাক্ষুব্ধ জনসমুদ্রের ফেনিল চূড়ায়
আধুনিক বাংলা কবিতা: কালান্তরে
ফসফরাসের মত জ্বলজ্বল
করতে থাকল
মিছিলের সেই মুখ।’
কিন্তু দুভাগ্যের বিষয় হল-একবার মহামিছিলের অগনন ভিড়ে ও যাঁকে চিহ্নিত করতে পেরে আশ্বস্ত হয়েছিলেন, জনারণ্যের কর্ষিত জমিতে স্বপের বীজ বুনেছিলেন, তাকে আর কোথাও দেখা গেল না। সভা ভেঙে গেলে পায়ে পায়ে মানুষ ছড়িয়ে পড়ল বিস্তৃত ভূমিতে। এবং-
‘পায়ে পায়ে হারিয়ে গেল
মিছিলের
সেই মুখ’।
অথচ চারিদিকে
অজস্র, অসংখ্য মুখ। সেই মুখশ্রীতে কোন না কোনো বিশ্বাস জাগানো প্রতিশ্রুতি আছে। তবে
সেই মুখ কখনো পূর্ণাঙ্গ স্বপ্ন গড়তে সক্ষম নয়। যে মুখ স্বপ্ন দেখায়, উজ্জীবিত করে তা
এ নয়-
‘কারো বাঁশির মত নাক ভালো লাগে,
কারো হরিণের মত চাহনি নেশা ধরায়-
কিন্তু হাত তাদের নামানো মাটির দিকে,
ঝঞ্জাক্ষুব্ধ সমুদ্রে জ্বলে ওঠে না তাদের
দৃপ্ত মুখ
ফসফরাসের মত’।
‘আমাকে উজ্জীবিত করে সমুদ্রের একটি স্বপ্ন
মিছিলের একটি মুখ’।
‘পচা শবের দুর্গন্ধ ঢাকার জন্যে
গায়ে সুগন্ধি
ঢালে,
তখন অপ্রতিদ্বন্ধী
সেই মুখ
নিষ্কোষিত,
তরবারির মত
জেগে উঠে আমাকে জাগায়’।
দুটি হৃদয়ের সেতুপথে
পারাপার করতে পারে’।
■ প্রশ্নোত্তর আলোচনা –
১) ‘মিছিলের মুখ’ কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ?
অগ্নিকোণ
২) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতাটি ‘অগ্নিকোণ’ কাব্যগ্রন্থের কোন কবিতা ?
৪ নং কবিতা
৩) ‘অগ্নিকোণ’
কাব্যগ্রন্থটি কাকে উৎসর্গ করা হয় ?
সিঙ্গাপুরের
তিন শহীদ যুবক যাদের ফাঁসি দেওয়া হয়।
৪) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতাটির চরণ সংখ্যা কত ?
৩৮
৫) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতায় স্তবক কটি?
৫
৬) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতায় তৃতীয় স্তবকে কটি চরণ আছে ?
৫টি
৭) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতায় কোন স্থানের নামের উল্লেখ আছে ?
ময়দান
৮) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতায় ‘মিছিল’ কথাটি কতবার আছে ?
৬ বার
৯) উল্লেখিত
শব্দসংখ্যা –
মিছিলের
সেই মুখ – ৩
মিছিলের
একটি মুখ – ১
মিছিলে একটি
মুখ – ১
১০) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতায় মিছিলের সেই মুখ কীসের মতো জ্বলজ্বল করে ?
ফসফরাসের
মতো
১১) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতায় কবিকে কে উজ্জীবিত করে ?
সমুদ্রের
একটি স্বপ্ন
১২) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতায় কেমন নাক ভালো লাগে ?
বাঁশির
মতো
১৩) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতায় উল্লেখিত কেমন চাহনি ভালো লাগে?
হরিণের
মতো
১৪) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতায় কীসের দুর্গন্ধ ঢাকার জন্য গায়ে সুগন্ধি ঢালা হয় ?
পচা শবের
১৫) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী সেই মুখ কীসের মতো কবিকে জাগায় ?
নিষ্কোষিত
তরবারির মতো
১৬) “_ ইমারতের
ভিড় ধ্বসিয়ে দিতে ডাক দিই” – ‘মিছিলের মুখ’ কবিতা অনুযায়ী পূরণ করো।
জরাজীর্ণ
১৭) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতায় প্রথম স্তবকে কয়টি চরণ আছে ?
৯ টি
১৮) ” _
কয়েকটি কেশাগ্র” – ‘মিছিলের মুখ’ কবিতা অনুযায়ী পূরণ করো
বিস্রস্ত
১৯) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতায় বিস্রস্ত কেশাগ্র কীসের মতো কম্পমান ?
আগুনের
শিখার মতো
২০) ‘ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ
সমুদ্র’ এর উল্লেখ ‘মিছিলের মুখ’ কবিতায় কোন স্তবকে আছে ?
তৃতীয়
স্তবকে
২১) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতার কোন স্তবকে ‘ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ জনসমুদ্রের উল্লেখ আছে ?
প্রথম
স্তবকে
২২) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতায় মুখ কথাটি কতবার আছে ?
৯ বার
২৫) ‘অগ্নিকোণ’ কাব্যগ্রন্থ কোন সালে প্রকাশিত হয় ?
১৯৪৮ সালে
২৬) ‘অগ্নিকোণ’
শব্দের আক্ষরিক অর্থ কী ?
দক্ষিণ-পূর্ব
দিক
২৭) ‘অগ্নিকোণ’
কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশে কটি কবিতা প্রকাশিত হয় ?
পাঁচটি
২৮) কোন
কোন কবিতা নিয়ে ‘অগ্নিকোণ’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ?
অগ্নিকোণ,
ঝড় আসছে, একটি কবিতার জন্য, মিছিলের মুখ ও রামরাম
২৯) ‘অগ্নিকোণ’
কাব্যগ্রন্থ লেখার উদ্দেশ্য কী ছিল ?
১৯৪৮ এর
কমিউনিষ্ট পার্টির জন্য দৈনিক টাকা তোলা
৩০) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতাটি কোন প্রেক্ষাপটে লেখা হয় ?
কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ। হলে
৩১) ভারতবর্ষে
কমিউনিস্ট পার্টি কবে নিষিদ্ধ করা হয় ?
১৯৪৮ খ্রি:
২৭শে মার্চ
৩২) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতাটি পরে কোন কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হয়?
চিরকুট
৩৩) ‘মিছিলের
মুখ’ কবিতাটি ‘চিরকুট’ কাব্যগ্রন্থের কততম কবিতা ?
২৭ নং
কবিতা
৩৪) ‘চিরকুট’
কাব্যটি প্রথম কবে প্রকাশিত হয় ?
বৈশাখ,
১৩৫৭ বঙ্গাব্দ


কোন মন্তব্য নেই
ok