কেবল আসার আশা ভবে আসা আসা মাত্র হল- রামপ্রসাদ
'কেবল আসার আশা ভবে আসা, আসা মাত্র হলো।' পদটির রচয়িতা কে ? কোন পর্যায়ের পদ? পদটির কাব্যসৌন্দর্য বিচার করো।
====================
আলোচ্য পদটি রামপ্রসাদ সেন রচিত। পদটি 'ভত্তের আকুতি পর্যায়ের অন্তর্গত।
এক সময় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- 'মানুষ যা চায় ভুল করে চায়, যা পায় তা চায় না।' কারণ জগৎ ও জীবনের রহস্য আজও রহস্যময়। সবাই তাকে জানতে চায়। লালন বাউল গানে শোনালেন 'ধরতে পারলে মনোবেড়া দিতাম পাখির পায়।' কিন্তু মানুষ কেবল প্রবৃত্তির কাছে বন্ধ থেকে যায়। বহুপূর্বে রামপ্রসাদ সেন আলোচ্য শাক্তপদে সেই সুরই শোনালেন 'কেবল আসার আশা ভবে আসা, আশা মাত্র হলো।' বস্তুত এখানে তিনি জগৎ ও জীবনের আসক্তি থেকে উদ্ধার চেয়েছেন এমন মনে করা হয়। তিনি আসলে পরক্ষণে দেখাতে চান- সমকালীন সমাজ জীবনের সঙ্কটকে। একদিকে অত্যাচারী দেশীয় জমিদার অন্যদিকে ইংরেজের অত্যাচার, উভয়ের ক্রমবর্ধমান লোভে অত্যাচারিত সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার ছবি পরিস্ফুট করেছেন। আলোচ্য পদটিতে তা কয়েকটি মাত্রায় উপস্থাপিত হয়েছে। যথা-
১. কল্পিত জগত ও বাস্তবতার প্রভেদ জান রহিত অবস্থান
২. দৃশ্য যোগ্য আকর্ষণ বনাম অদৃশ্য জীবনের চলমানতা
৩. রুঢ় বাস্তবতা
৪. মানুষের জীবন কেন্দ্রিক আশা-নিরাশা
৫. উৎসে ফিরে আসা
মর্ত জগতে আগমন করা ব্যর্থ মনে হয়েছে। পদ্ম-চিত্রে ভ্রমরের আটকে থাকা একদিকে যেমন কল্পনা ও বাস্তবতার জ্ঞানশূণ্য মস্তিষ্কের পরিচয় বহন করে তেমনি দৃশ্য যোগ্য আকর্ষণে আকর্ষিত থেকে অদৃশ্য জীবনের চলমানতাকেও অস্বীকার করে। মানবমনের বদ্ধকুঠুরিতে অবস্থানরত প্রবৃত্তির খেলায় মানুষ যখন কামনা-বাসনা-লোভ ইত্যাদির বশবর্তী হয়ে পড়ে তখন সে জীবনের আদর্শ ও উচিৎ-অনুচিত বোধ হারিয়ে ফেলে। এ বিষয়টাকেই কবি তুলে ধরেছেন ভ্রমরের প্রতীকে-
'যেমন চিত্রের পরেতে পড়ে, এমর ভুলে র'লো।'
পারস্পরিক নির্ভরশীলতায় গড়ে ওঠে মানুষের সমাজ। মানব-ইকোসিস্টেমে তার প্রবাহ চলে। এ সত্য অনেকাংশ মানুষের কাছে অবোধ্য থেকে যায়। মানুষ সাময়িক সুখের জন্য বস্তু সংগ্রহে ব্যস্ত থাকে। যদিও বস্তু সংগ্রহে নয়, উপযুক্ত ব্যবহারেই সে সম্পদে পরিণত হয়। তাই এক দিকে সৃষ্টি হয় মন্বন্তর অন্যদিকে বস্তুর সংগ্রহ ক্ষেত্র তথা কালোবাজার। এই রূঢ় বাস্তবতাকে কবি তুলে ধরেছেন এভাবে-
'মা, নিম খাওয়ালে চিনি বলে, কথায় করে ছলো।
ওমা মিঠার লোভে তিত মুখে সারাদিনটা গেল।।'
এখানে কেবল জগতের মায়ায় অহেতুক আকর্ষণ ও সেই লোভে পাপ, পাপে স্বপ্নের মৃত্যু দেখানো হয়নি। দেখনো হয়েছে- এই জগতের সেই রূপকে যেখানে মানুষ মানুষকে 'চিনি'র নাম করে 'নিম' খাওয়ায়। অর্থাৎ লোক ঠকানো ধান্দাবাজী কারবার দেখানো হয়েছে। যেখানে অত্যাচারী শাসক লোভ কিংবা ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষের যাবতীয়
সম্বলকে আত্মস্মাৎ করে। কেবল শাসকশ্রেণি নয়, অধিকাংশ মানুষই নিজেদের প্রবৃত্তিকে সংযত করতে না পেরে, প্রবৃত্তিরই শিকার হয়ে যায়। তখন- 'মিঠার লোভে তিত মুখে' জীবন কাটানো দায় হয়ে ওঠে। নিয়তির খেলা হিসেবে তখন ভাগ্যকে দোষ দেওয়া যায়। কিন্তু এটাই যে ভবের লীলা সে ভাবনার উদয় তবুও হয় না। মানুষ এটাই বুঝতে পারলো না, ভগবান মানুষের ভুল হয়তো ক্ষমা করতে পারে, কিন্তু প্রকৃতি পরিবেশ কোনো দিন ক্ষমা করবে না। মানুষের জীবন কেন্দ্রিক আশা-নিরাশা পরিবেশ ও মানুষের পারস্পরিক নির্ভরশীলতায় গড়ে ওঠে। কখনো সাধারণ মানুষকে ঠকায় বুদ্ধিদীপ্ত শাসক শ্রেণি, আবার কখনো তাকেই ঠকে যেতে হয় অন্য কোনো শ্রেণির কাছে। ভারতের ইতিহাস এই সত্যকে বারবার প্রমাণিত করেছে। তাই ভবের খেলায়-
'আশা না পুরিল।।
রামপ্রসাদ বলে, ভবের খেলায়, যা হবার তাই হলো।'
- এক্ষেত্রে মনে হতে পারে এই পৃথিবীর প্রতি মায়াই মানুষের জীবনের কাল হলো, তাই পৃথিবী থেকে উদ্ধারই আসল লক্ষ্য। এ ভাবনা অনেকাংশে সত্য কিন্তু সম্পূর্ণ নয়। ধর্মীয় দৃষ্টিতে এ সত্য হতে পারে কিন্তু এ সাহিত্যের সত্য নয়। পৃথিবী ও পৃথিবীবাসীকে ভালোবাসার কথাই সাহিত্য চিরকাল বলে যাবে। তাই কবি যখন বলেন-
'এখন সন্ধ্যাবেলায়, কোলের ছেলে ঘরে নিয়ে চলো।'
তখন মর্তলোক ছেড়ে স্বর্গলোক যাওয়ার সুর ধ্বনিত হলেও, এ সুরের মধ্যে দিয়ে যে কাব্যিক ব্যাঞ্জনাফুটে ওঠে সেখানে I live simply movement (আমি কেবল নড়াচড়া করে বেঁচে আছি)। স্মরণে আসে। কৃত্রিম বস্তু থেকে ক্রমশ কৃত্রিম মনের অধিবাসীদের জগৎ হয়ে ওঠা এই পৃথিবী যে বাসযোগ্য নয় সেই সত্যকে কবি স্মরণ করিয়ে দিতে চান। 'কোলের ছেলে' শব্দ প্রয়োগে তারই ইঙ্গিত রয়েছে। কারণ কোলের ছেলে কৃত্রিম অনুভূতির ধারক নয়। প্রাকৃতিক সজীবতা, স্বতস্ফূর্ততা ও মায়ের নিঃস্বার্থ আন্তরিকতাই 'ঘরে নিয়ে চলো'র আবেদনকে জারিত রেখেছে। তাই পদটি মায়াময় মর্তভূমি ছেড়ে স্বর্গভূমির আহ্বানে নয়, মর্তভূমিকেই স্বর্গক্ষেত্র গড়ে তোলার বাসনায় রূঢ়বাস্তবতার মধ্যে আত্ম বিশ্লেষণের দাবী রাখে। আর এভাবেই পদটি শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রম করার পরেও আজ সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক। এই প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকাটাই পদটির কাব্যসৌন্দর্য ও কবি কৃতিকে পরিস্ফুট করে।
========================
লাইক ও কমেন্ট করতে ভোলো না।

কোন মন্তব্য নেই
ok